কারামুক্ত আইভী আবারও আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে। প্রায় ১৩ মাস কারাভোগের পর জামিনে মুক্তি পেয়েছেন নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র সেলিনা হায়াৎ আইভী। তার মুক্তিকে ঘিরে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। বিশেষ করে আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে অংশ নেওয়ার পরিকল্পনার কথা সামনে আসায় রাজনৈতিক মহলে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। বুধবার রাত ১০টা ৮ মিনিটে গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে মুক্তি পান সেলিনা হায়াৎ আইভী। কারা কর্তৃপক্ষ জানায়, তার বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া বিভিন্ন মামলায় আদালতের দেওয়া জামিন বহাল থাকায় মুক্তির ক্ষেত্রে আর কোনো আইনি বাধা ছিল না।
কারাগারের জেলার শিরিন আক্তার জানান, সন্ধ্যায় জামিনসংক্রান্ত নথিপত্র কারা কর্তৃপক্ষের হাতে পৌঁছানোর পর তা যাচাই-বাছাই করা হয়। প্রয়োজনীয় প্রক্রিয়া শেষ করে রাতেই তাকে মুক্তি দেওয়া হয়। পরে পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কারাগার ত্যাগ করেন তিনি। কারা অধিদপ্তরের সহকারী কারা মহাপরিদর্শক জান্নাত উল ফরহাদ বলেন, উচ্চ আদালত এবং সংশ্লিষ্ট বিচারিক আদালতের জামিন আদেশ যথাযথভাবে কারা কর্তৃপক্ষের কাছে পৌঁছায়। পাশাপাশি তার বিরুদ্ধে থাকা অন্যান্য মামলাতেও জামিন নিশ্চিত হওয়ায় মুক্তির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়।
কারা সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৯ মে নারায়ণগঞ্জ শহরের দেওভোগ এলাকার নিজ বাসা থেকে গ্রেপ্তার করা হয় সেলিনা হায়াৎ আইভীকে। পরে তাকে কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারে পাঠানো হয়। এরপর দীর্ঘ সময় তিনি কারাগারে অবস্থান করেন। মুক্তির সময় কারাগারের বাইরে তার স্বজন, আইনজীবী এবং ঘনিষ্ঠজনেরা উপস্থিত ছিলেন। তবে কারাগার থেকে বের হওয়ার পর তিনি সাংবাদিকদের সঙ্গে কোনো কথা বলেননি। সরাসরি গাড়িতে উঠে সেখান থেকে চলে যান।
কারামুক্ত আইভী-এর আইনজীবী অ্যাডভোকেট আওলাদ হোসেন দাবি করেন, তার মক্কেলের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া মামলাগুলোর কোনো শক্ত ভিত্তি নেই। তিনি বলেন, দীর্ঘ এক বছরেরও বেশি সময় কারাবন্দি থাকার পর উচ্চ আদালতের জামিন আদেশ আইভীর মুক্তির পথ সুগম করেছে। আইনজীবীর ভাষ্য অনুযায়ী, হাইকোর্টের জামিন আদেশ স্থগিত করার জন্য রাষ্ট্রপক্ষ চেম্বার আদালতে আবেদন করলেও পরবর্তীতে আপিল বিভাগ সেই আদেশ বহাল রাখে। ফলে তার মুক্তির ক্ষেত্রে আর কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকেনি।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, আইভীর আইনজীবী জানিয়েছেন যে তিনি শুধু আইনি লড়াই চালিয়ে যাবেন না, বরং ভবিষ্যতে নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের নির্বাচনে অংশ নেওয়ারও পরিকল্পনা করছেন। এ ঘোষণার পর থেকেই স্থানীয় রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন সমীকরণের আলোচনা শুরু হয়েছে। আদালত সূত্রে জানা গেছে, বৈষম্যবিরোধী আন্দোলন ঘিরে দায়ের হওয়া হত্যা ও হত্যাচেষ্টাসহ একাধিক মামলায় তিনি জামিন লাভ করেন। এসব মামলায় হাইকোর্টের দেওয়া জামিনাদেশ পরবর্তীতে আপিল বিভাগও বহাল রাখে।
এ ছাড়া গ্রেপ্তার দেখানোর বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে তিনি উচ্চ আদালতে রিট আবেদন করেছিলেন। আদালত প্রাথমিক শুনানি শেষে রুল জারি করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। ওই রুলে বারবার মামলায় জড়ানোর বিষয়টি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়। পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন মামলায় পর্যায়ক্রমে জামিন পান সেলিনা হায়াৎ আইভী। রাষ্ট্রপক্ষ একাধিকবার জামিন আদেশ স্থগিতের আবেদন করলেও শেষ পর্যন্ত উচ্চ আদালতের সিদ্ধান্ত বহাল থাকে। এর ফলে তার মুক্তির পথ পুরোপুরি পরিষ্কার হয়।
নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে সেলিনা হায়াৎ আইভী দীর্ঘদিন ধরে একটি পরিচিত নাম। ২০০৩ সালে প্রথমবার নারায়ণগঞ্জ পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। পরবর্তীতে ২০১১ সালে সিটি করপোরেশন গঠনের পর টানা তিনবার মেয়র নির্বাচিত হয়ে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় নিজের শক্ত অবস্থান তৈরি করেন। শুধু জনপ্রতিনিধি হিসেবেই নয়, রাজনৈতিক অঙ্গনেও তার সক্রিয় উপস্থিতি রয়েছে। তিনি নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র সহসভাপতির দায়িত্ব পালন করে আসছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা এবং স্থানীয় পর্যায়ে তার জনপ্রিয়তা তাকে এখনো গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, কারামুক্তির পর আইভীর সক্রিয় রাজনীতিতে প্রত্যাবর্তন নারায়ণগঞ্জের রাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বিশেষ করে আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনকে সামনে রেখে তার সম্ভাব্য অংশগ্রহণ স্থানীয় রাজনীতিকে আরও প্রতিযোগিতাপূর্ণ করে তুলতে পারে। সব মিলিয়ে, কারামুক্ত আইভী এখন শুধু আইনি লড়াইয়ের অধ্যায় পেরিয়ে রাজনৈতিক ভবিষ্যতের দিকে নজর দিচ্ছেন। আগামী সিটি করপোরেশন নির্বাচনে তার অংশগ্রহণের পরিকল্পনা বাস্তবায়িত হলে নারায়ণগঞ্জের রাজনৈতিক অঙ্গনে নতুন আলোচনা ও সমীকরণের জন্ম দিতে পারে।























