ময়মনসিংহের ভালুকায় মানবিক সংকটের এক হৃদয়বিদারক ঘটনা সামনে এসেছে। নয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রী ও দুই কন্যাসন্তানকে ফেলে রেখে একমাত্র ছেলেকে সঙ্গে নিয়ে নিখোঁজ হয়েছেন বিল্লাল হোসেন নামের এক বাসচালক। স্বামীর খোঁজ না পেয়ে, বাসা হারিয়ে এবং আশ্রয়হীন অবস্থায় কয়েকদিন কাটানোর পর বর্তমানে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসাধীন রয়েছেন তার স্ত্রী মাহমুদা আক্তার।
জানা গেছে, প্রায় আট বছর আগে পারিবারিকভাবে তাদের বিয়ে হয়। সংসারে তিন সন্তান—জমজ আছিয়া আক্তার মীম ও মাহমুদুজ্জামান ইয়াসিন (৭) এবং ছোট মেয়ে হাফসা জীম (দেড় বছর)। বর্তমানে মাহমুদা চতুর্থ সন্তানের জন্মের অপেক্ষায় রয়েছেন।
মাহমুদার ভাষ্য অনুযায়ী, কোরবানির ঈদের আগে নতুন বাসায় ওঠার কিছুদিন পর বিল্লাল হোসেন হঠাৎ ছেলে ইয়াসিনকে সঙ্গে নিয়ে বের হয়ে যান। এরপর থেকে তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। আত্মীয়-স্বজন, কর্মস্থল ও পরিচিতজনদের মাধ্যমে অনেক খোঁজাখুঁজির পরও তার কোনো সন্ধান মেলেনি।
স্বামী নিখোঁজ হওয়ার পর কয়েক মাসের বাড়িভাড়া বকেয়া থাকায় বাড়ির মালিকও তাকে দুই মেয়েসহ বাসা ছাড়তে বাধ্য করেন। ফলে মাথা গোঁজার ঠাঁই হারিয়ে তিনি কার্যত রাস্তায় নেমে আসেন।
মাহমুদা দাবি করেন, স্বামীর ব্যবসা ও সংসার চালাতে বাবার রেখে যাওয়া উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া জমি বিক্রি করে কয়েক লাখ টাকা বিল্লালকে দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই টাকা ফেরত তো দূরের কথা, এখন স্বামীই তাকে ছেড়ে চলে গেছেন।
তিনি বলেন, বাবা মারা যাওয়ার পর ভাইদের সঙ্গেও সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। ফলে স্বামীর সংসার ভেঙে পড়ার পর যাওয়ার মতো কোনো নিরাপদ আশ্রয়ও তার ছিল না।
মাহমুদা অভিযোগ করেন, একমাত্র ছেলে থাকলেও দুই মেয়ে জন্ম দেওয়ার কারণে স্বামী প্রায়ই তাকে শারীরিক ও মানসিকভাবে নির্যাতন করতেন। ছেলে সন্তানকে বেশি গুরুত্ব দিতেন এবং মেয়েদের প্রতি উদাসীন আচরণ করতেন।
তিনি আরও জানান, সংসারে প্রায়ই অশান্তি হতো। বিভিন্ন সময় তাকে মারধরও করা হয়েছে। তবে সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা ভেবে তিনি সবকিছু সহ্য করে সংসার টিকিয়ে রাখার চেষ্টা করেছিলেন।
বাসা থেকে বের হয়ে যাওয়ার পর ১৫ জুলাই রাতে তিনি দুই মেয়েকে নিয়ে ভালুকা ট্রাকস্ট্যান্ড এলাকার বায়তুল ফালাহ জামে মসজিদের পাশে একটি টিনশেডে আশ্রয় নেন।
সেখানে স্থানীয় ট্রাকচালক, দোকানদার ও পথচারীরা মানবিক কারণে তাদের খাবারের ব্যবস্থা করেন। কেউ কলা, কেউ বিস্কুট, আবার কেউ রান্না করা খাবার এনে দেন। কয়েকদিন এভাবেই মানুষের সহানুভূতির ওপর নির্ভর করে জীবন কাটান তারা।
স্থানীয় স্বেচ্ছাসেবী মোস্তানছির বিল্লা জোহাদ বিষয়টি দেখে উদ্বিগ্ন হন। পরে ১৯ জুলাই রাতে জাতীয় জরুরি সেবা ৯৯৯-এ ফোন করা হলে ভালুকা মডেল থানা পুলিশ দ্রুত ঘটনাস্থলে গিয়ে মা ও দুই শিশুকে উদ্ধার করে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করে।
হাসপাতালে ভর্তি হওয়ার পর চিকিৎসকেরা তার শারীরিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেন। যেহেতু তিনি পূর্ণগর্ভবতী, তাই প্রসবকালীন জটিলতার আশঙ্কায় তাকে পর্যবেক্ষণে রাখা হয়েছে।
খবর পেয়ে উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) ইকবাল হোসাইন এবং উপজেলা মহিলা বিষয়ক কর্মকর্তা জাহেদা ফেরদৌসী হাসপাতালে গিয়ে তার সঙ্গে কথা বলেন। তারা প্রয়োজনীয় সরকারি সহায়তার আশ্বাস দেন।
উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে কিছু আর্থিক সহায়তা এবং খাদ্যসামগ্রী দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি মা ও শিশুদের নিরাপদ আশ্রয় নিশ্চিত করতে সমাজসেবা বিভাগ, মহিলা বিষয়ক অধিদপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের মাধ্যমে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার কথাও জানানো হয়েছে।
এদিকে বিল্লালের কর্মস্থল হ্যামকো ব্যাটারির স্থানীয় এজেন্ট মো. আনোয়ার হোসেন খান জানান, বিল্লাল তাদের প্রতিষ্ঠানের বাসচালক ছিলেন। কোরবানির ঈদের পর তিনি দায়িত্বে থাকা গাড়ি থেকে প্রায় ২০০ লিটার জ্বালানি বিক্রি করে দেন এবং তিন দিনের প্রায় ৫০ হাজার টাকা প্রতিষ্ঠানের পাওনা নিয়ে নিখোঁজ হয়ে যান। এরপর থেকে তার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানেরও কোনো যোগাযোগ নেই।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, বিল্লালের বিরুদ্ধে আত্মসাৎ, পরিবার পরিত্যাগ এবং স্ত্রী-সন্তানের ভরণপোষণ না দেওয়ার অভিযোগে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে। পুলিশ তার অবস্থান শনাক্তে তথ্য সংগ্রহ করছে। কোনো সুনির্দিষ্ট অভিযোগ দায়ের হলে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নারী ও শিশু অধিকারকর্মীরা বলছেন, এমন ঘটনা শুধু একটি পরিবারের সংকট নয়; এটি নারী ও শিশুর নিরাপত্তা, ভরণপোষণের অধিকার এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধের প্রশ্নও তুলে ধরে। তারা প্রশাসনের পাশাপাশি সমাজের বিত্তবান ও মানবিক মানুষদের এই পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন।



























