মাদারীপুরের ডাসার উপজেলায় যৌতুকের দাবিতে দীর্ঘদিন ধরে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হয়ে এক গৃহবধূর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। পরিবারের দাবি, স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের নির্যাতন সহ্য করতে না পেরে বিষাক্ত কেমিক্যাল পান করেন ওই গৃহবধূ। এ ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত স্বামীসহ শ্বশুরবাড়ির সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মঙ্গলবার (২১ জুলাই) দুপুরে উপজেলার আজালিয়া গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সুমি আক্তার মিম (২২) বরিশালের আগৈলঝাড়া উপজেলার ভালুকশী গ্রামের আলিম হাওলাদারের মেয়ে। প্রায় দুই বছর আগে ডাসার উপজেলার আজালিয়া গ্রামের ফরহাদ আকনের সঙ্গে তার বিয়ে হয়।
বিয়ের পর থেকেই যৌতুকের চাপ
নিহতের পরিবারের ভাষ্য, বিয়ের পর থেকেই মিমের ওপর যৌতুকের জন্য চাপ সৃষ্টি করা হতো। প্রথম দিকে বিভিন্ন অজুহাতে টাকা দাবি করা হলেও পরে ১০ লাখ টাকা দেওয়ার জন্য বারবার চাপ দেওয়া হয়। অভিযোগ রয়েছে, স্বামী ফরহাদ বিদেশে যাওয়ার সময় যে ঋণ করেছিলেন, তা পরিশোধের জন্য শ্বশুরবাড়ির লোকজন মিমের বাবার কাছ থেকে ওই অর্থ আদায় করতে চেয়েছিলেন।
পরিবারের সদস্যরা জানান, অর্থ দিতে অস্বীকৃতি জানালে মিমকে নিয়মিত শারীরিকভাবে মারধর করা হতো এবং নানা ধরনের মানসিক নির্যাতন চালানো হতো। বিষয়টি নিয়ে একাধিকবার দুই পরিবারের মধ্যে সালিশও হয়েছে বলে দাবি করেন তারা। তবে কোনো সমাধান না হওয়ায় নির্যাতন চলতেই থাকে।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার দুপুরেও যৌতুকের টাকা নিয়ে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে তর্ক-বিতর্ক শুরু হয়। একপর্যায়ে পারিবারিক বিরোধ চরমে পৌঁছালে মিম ঘরে থাকা একটি বিষাক্ত কৃষি কেমিক্যাল পান করেন বলে জানা যায়।
পরিবারের সদস্যরা দ্রুত তাকে উদ্ধার করে প্রথমে কালকিনি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। সেখানে তার অবস্থার অবনতি হলে কর্তব্যরত চিকিৎসক উন্নত চিকিৎসার জন্য মাদারীপুর ২৫০ শয্যা জেলা হাসপাতালে পাঠান। পরে সেখানে নেওয়া হলে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
মিমের মৃত্যুর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর থেকেই স্বামী ফরহাদ আকন, শ্বশুর-শাশুড়িসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা বাড়ি ছেড়ে চলে যান বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের স্বজনরা। তারা এ ঘটনাকে আত্মহত্যা নয়, বরং দীর্ঘদিনের নির্যাতনের পরিণতি হিসেবে দেখছেন।
নিহতের বাবা আলিম হাওলাদার বলেন, “আমার মেয়েকে দীর্ঘদিন ধরে নির্যাতন করা হয়েছে। ১০ লাখ টাকা যৌতুকের জন্য বারবার চাপ দেওয়া হয়েছে। আমরা টাকা দিতে না পারায় তাকে অত্যাচার করা হতো। আমার মেয়ের মৃত্যুর জন্য ওর স্বামী ও শ্বশুরবাড়ির লোকজন দায়ী। আমরা তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
ডাসার থানার পুলিশ জানিয়েছে, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে যায়। মরদেহের সুরতহাল প্রতিবেদন প্রস্তুত করে ময়নাতদন্তের জন্য মাদারীপুর সদর হাসপাতালের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
পুলিশের একটি সূত্র জানায়, ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে তদন্ত চলছে। নিহতের পরিবারের অভিযোগের ভিত্তিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের প্রস্তুতি চলছে। অভিযুক্তদের গ্রেপ্তারে অভিযানও পরিচালনা করা হবে।
পুলিশ জানিয়েছে, ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন এবং তদন্তে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিশ্চিত করা হবে। যৌতুক নিরোধ আইন এবং প্রয়োজনীয় অন্যান্য ধারায় মামলা দায়েরের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে লিখিত অভিযোগ পেলে দ্রুত মামলা রুজু করা হবে।
মিমের অকাল মৃত্যুতে এলাকায় শোকের ছায়া নেমে এসেছে। প্রতিবেশীরা জানান, তিনি শান্ত স্বভাবের ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে পারিবারিক অশান্তির বিষয়টি অনেকেই জানতেন। তারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত এবং দোষীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন।




























