যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সামরিক উত্তেজনা আরও তীব্র হওয়ায় আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে নতুন করে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে। এর প্রভাবে সোমবার (২০ জুলাই) বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম ৩ শতাংশের বেশি বেড়েছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ব্যারেলপ্রতি ৯০ ডলার অতিক্রম করেছে, যা এক মাসেরও বেশি সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত দীর্ঘায়িত হলে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজারে আরও চাপ তৈরি হতে পারে।
বার্তাসংস্থা রয়টার্সের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার ব্রেন্ট অপরিশোধিত তেলের ফিউচার ২ দশমিক ৬৯ ডলার বা ৩ দশমিক ০৫ শতাংশ বেড়ে ব্যারেলপ্রতি ৯০ দশমিক ৭৯ ডলারে পৌঁছেছে। এটি ১১ জুনের পর সর্বোচ্চ মূল্য। এর আগে গত সপ্তাহে ব্রেন্টের দাম ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ বেড়েছিল, যা এপ্রিলের পর সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক উল্লম্ফন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
একই সময়ে মার্কিন ওয়েস্ট টেক্সাস ইন্টারমিডিয়েট (ডব্লিউটিআই) অপরিশোধিত তেলের দামও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। সোমবার এর মূল্য ২ দশমিক ১৯ ডলার বা ২ দশমিক ৬৫ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়ে ব্যারেলপ্রতি ৮৪ দশমিক ৬৮ ডলারে দাঁড়িয়েছে। এটি ১২ জুনের পর সর্বোচ্চ অবস্থান। গত সপ্তাহে ডব্লিউটিআইয়ের দামও ১৫ দশমিক ৫ শতাংশ বেড়েছে, যা মার্চের শুরু থেকে সবচেয়ে বড় সাপ্তাহিক বৃদ্ধি।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাতই তেলের দামের প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে উঠেছে। সপ্তাহান্তে যুক্তরাষ্ট্র টানা নবম রাতের মতো ইরানের বিভিন্ন লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালিয়েছে। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র কুয়েত ও বাহরাইনও নতুন করে ইরানি হামলার তথ্য জানিয়েছে। ফলে পুরো অঞ্চলে নিরাপত্তা পরিস্থিতি আরও অনিশ্চিত হয়ে উঠেছে।
উভয় পক্ষের মধ্যে উত্তেজনার আরেকটি বড় কারণ সমুদ্রপথে নৌ চলাচল। যুক্তরাষ্ট্র জানিয়েছে, তারা ইরানের বন্দরগুলোর ওপর নৌ অবরোধ আরোপ করেছে। অন্যদিকে ইরান দাবি করেছে, হরমুজ প্রণালিতে চলাচলের নিয়ম লঙ্ঘনকারী জাহাজগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করা হচ্ছে। বিশ্বের মোট তেল বাণিজ্যের প্রায় ২০ শতাংশ এই গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ দিয়েই পরিচালিত হয়। তাই এখানকার যেকোনো অস্থিরতা বৈশ্বিক বাজারে সরাসরি প্রভাব ফেলে।
এদিকে সোমবার ভোরে যুক্তরাজ্যের মেরিটাইম ট্রেড অপারেশনস এজেন্সি ওমানের কুমজারের উত্তর-পশ্চিমে একটি জাহাজে আগুন লাগার তথ্য জানিয়েছে। যদিও ঘটনার কারণ তাৎক্ষণিকভাবে জানা যায়নি, তবে এটি মধ্যপ্রাচ্যের সামুদ্রিক নিরাপত্তা নিয়ে নতুন উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। বাজার বিশ্লেষকদের মতে, এমন ঘটনার পুনরাবৃত্তি হলে জাহাজ চলাচল ও তেল সরবরাহ আরও ব্যাহত হতে পারে।
বার্কলেজের বিশ্লেষক অমরপ্রীত সিং জানিয়েছেন, পুনরায় আরোপিত দ্বৈত অবরোধের কারণে অঞ্চলটি থেকে তেল রপ্তানি কতটা স্বাভাবিক থাকবে, তা আগামী কয়েক দিন ও সপ্তাহের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করবে। তার মতে, বাজার এখনো সম্ভাব্য সরবরাহ সংকটের ঝুঁকিকে পুরোপুরি মূল্যায়ন করছে না। বৈশ্বিক তেলের মজুতও বর্তমানে গত পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে রয়েছে, যা ভবিষ্যতে দামের ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করতে পারে।
এলএসইজি-এর তথ্য অনুযায়ী, রোববার (১৮ জুলাই) হরমুজ প্রণালি দিয়ে মাত্র চারটি জাহাজ চলাচল করেছে, যা আগের দিনের আটটির তুলনায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। একই সময়ে অন্তত তিনটি তেলবাহী ট্যাংকার এবং একটি ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার তেল বোঝাইয়ের জন্য প্রণালীতে প্রবেশ করেছে। বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তেজনা অব্যাহত থাকলে আন্তর্জাতিক জ্বালানি বাজারে মূল্য অস্থিরতা আরও বাড়তে পারে এবং এর প্রভাব বিশ্ব অর্থনীতিতেও পড়তে পারে।



























