শুধু প্রাপ্তবয়স্কদের নয়, এখন শিশু ও কিশোরদের মধ্যেও দ্রুত বাড়ছে ফ্যাটি লিভারের সমস্যা। চিকিৎসকদের মতে, অতিরিক্ত ওজন, অস্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস, দীর্ঘ সময় মোবাইল বা স্ক্রিনে থাকা এবং শরীরচর্চার অভাবের কারণে এই ঝুঁকি আশঙ্কাজনক হারে বাড়ছে। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, রোগের শুরুতে সাধারণত কোনো স্পষ্ট লক্ষণ দেখা যায় না। ফলে অনেক ক্ষেত্রেই দেরিতে রোগ শনাক্ত হয় এবং ততদিনে লিভারের ক্ষতি শুরু হয়ে যেতে পারে।
সম্প্রতি ভারতে ১১ থেকে ১৫ বছর বয়সী স্কুলশিক্ষার্থীদের ওপর পরিচালিত একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, যাদের ওজন স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি, তাদের ৬২ শতাংশের লিভারে মেদ জমার সমস্যা রয়েছে। অথচ তাদের অধিকাংশের শরীরে কোনো দৃশ্যমান উপসর্গ ছিল না। চিকিৎসকদের মতে, এ তথ্য শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে নতুন করে উদ্বেগ তৈরি করেছে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু শরীরের ওজন নয়, পেটের অতিরিক্ত মেদ এবং শরীরের বিপাকক্রিয়ার ভারসাম্য নষ্ট হওয়ার সঙ্গেও ফ্যাটি লিভারের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রয়েছে। তাই শুধু ওজন কমানো নয়, স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন নিশ্চিত করাও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
কেন বাড়ছে শিশুদের ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি?
চিকিৎসকদের মতে, বর্তমান জীবনধারাই এই সমস্যার অন্যতম বড় কারণ। বিশেষ করে—
- অতিরিক্ত ওজন ও স্থূলতা
- ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমে যাওয়া
- অতিরিক্ত চিনিযুক্ত কোমল পানীয় পান করা
- ময়দা ও প্রক্রিয়াজাত খাবার বেশি খাওয়া
- উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি ঝোঁক
- নিয়মিত শরীরচর্চা না করা
- পর্যাপ্ত খেলাধুলার অভাব
- দীর্ঘ সময় মোবাইল, ট্যাব বা টিভির সামনে থাকা
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব অভ্যাস শিশুদের শরীরে অতিরিক্ত ক্যালরি জমায়, যা ধীরে ধীরে যকৃতে চর্বি জমার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।
কেন এই রোগকে ‘নীরব ঘাতক’ বলা হয়?
ফ্যাটি লিভারের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো, প্রাথমিক পর্যায়ে এর কোনো স্পষ্ট লক্ষণ থাকে না। অনেক শিশু সম্পূর্ণ স্বাভাবিক জীবনযাপন করলেও তাদের লিভারে মেদ জমতে পারে।
চিকিৎসকদের মতে, সময়মতো চিকিৎসা বা জীবনধারায় পরিবর্তন না আনলে—
- লিভারে প্রদাহ হতে পারে
- লিভারের কার্যক্ষমতা কমে যেতে পারে
- দীর্ঘমেয়াদে গুরুতর লিভার রোগের ঝুঁকি বাড়তে পারে
তাই ঝুঁকিতে থাকা শিশুদের নিয়মিত স্বাস্থ্য পরীক্ষা এবং চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
খাদ্যাভ্যাসে পরিবর্তন আনাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ
বিশেষজ্ঞদের মতে, ফ্যাটি লিভার প্রতিরোধে ও নিয়ন্ত্রণে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত চিনি ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবার কমিয়ে দিলে লিভারে মেদ জমার প্রবণতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমতে পারে।
চিকিৎসকদের ভাষায়, শুধু তেল বা চর্বি নয়, বরং অতিরিক্ত ক্যালরি, অনিয়মিত জীবনযাপন এবং শারীরিক নিষ্ক্রিয়তাই এই রোগের বড় কারণ।
তারা আরও জানান, সব ধরনের তেল ক্ষতিকর নয়। কিছু তেলে এমন উপাদান রয়েছে, যা লিভারের জন্য উপকারী হতে পারে। গবেষণায় ভিটামিন ই-এর একটি বিশেষ রূপের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, যা অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট হিসেবে কাজ করে এবং প্রদাহ কমাতে সহায়তা করতে পারে। এই উপাদান পাম তেল ও চালের কুঁড়ার তেলে কিছু পরিমাণে পাওয়া যায়। তবে এ বিষয়ে চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী খাদ্যাভ্যাস অনুসরণ করাই সবচেয়ে নিরাপদ।
শিশুদের সুস্থ রাখতে যা করবেন
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী কয়েকটি অভ্যাস শিশুদের ফ্যাটি লিভারের ঝুঁকি কমাতে সাহায্য করতে পারে—
- প্রতিদিন স্বাস্থ্যকর ও সুষম খাবার খাওয়ান।
- চিনিযুক্ত পানীয় ও প্রক্রিয়াজাত খাবার সীমিত করুন।
- নিয়মিত খেলাধুলা ও শারীরিক কার্যক্রমে উৎসাহ দিন।
- মোবাইল, ট্যাব ও টিভির সামনে কাটানো সময় কমান।
- পর্যাপ্ত ঘুম নিশ্চিত করুন।
- শিশুর ওজন স্বাভাবিক রাখতে নিয়মিত নজর রাখুন।
- প্রয়োজনে চিকিৎসকের পরামর্শে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করান।
বিশেষজ্ঞদের মতে, শিশুদের ফ্যাটি লিভার এখন আর বিরল কোনো সমস্যা নয়। তবে সময়মতো সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাস এবং নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে এই ঝুঁকি অনেকটাই কমানো সম্ভব। তাই শিশুদের সুস্থ ভবিষ্যৎ নিশ্চিত করতে পরিবারের সদস্যদের এখন থেকেই এ বিষয়ে আরও সচেতন হওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন চিকিৎসকরা।
























