একজনের পাসপোর্ট ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তিকে ইতালি পাঠানোর অভিযোগে দায়ের করা মামলায় গ্রেপ্তারের চার দিনের মাথায় প্রধান আসামি মো. বেলায়েত হোসেন জামিন পেয়েছেন। বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) ঢাকার মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট নাজমিন আক্তার শুনানি শেষে তার জামিন মঞ্জুর করেন। তবে একই মামলার আরেক আসামি নাজমুল হাসানকে রিমান্ড শেষে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
রিমান্ড শেষে দুই আসামিকে আদালতে হাজির করা হলে তদন্ত কর্মকর্তা তাদের কারাগারে আটক রাখার আবেদন করেন। বেলায়েত হোসেনের পক্ষে আইনজীবী জামিন আবেদন করলে রাষ্ট্রপক্ষ তার বিরোধিতা করে। শুনানি শেষে আদালত বেলায়েতকে জামিন দেন এবং নাজমুল হাসানকে কারাগারে পাঠানোর নির্দেশ দেন।
এর আগে সোমবার রাজধানীর গুলশান-১ এলাকা থেকে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি) অভিযান চালিয়ে চক্রটির সাত সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। পরদিন আদালত দুই আসামির একদিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন। বাকি পাঁচ আসামি—মেহেদী হাসান, কাওসার হোসেন, মো. সোলাইমান সুমন, মো. তৌহিদুর রহমান ও ফজলে রাব্বীকে কারাগারে পাঠানো হয়।
মামলার বাদী তাসলিমা আক্তার জানান, তার স্বামী প্রায় ১১ বছর ধরে ইতালিতে বসবাস করছেন। চার সন্তানকে নিয়ে স্বামীর কাছে যাওয়ার জন্য তিনি দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে ইতালির ভিসার চেষ্টা করছিলেন।
২০২৪ সালের ১৫ ডিসেম্বর তিনি ঢাকায় ইতালি দূতাবাসে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেন। দীর্ঘ সময় অপেক্ষার পরও ভিসা না পাওয়ায় তার পাসপোর্টের মেয়াদ শেষ হয়ে যায়। পরে দূতাবাস থেকে পাসপোর্ট সংগ্রহের সময় আসামি নাজমুল হাসান ২৪ ঘণ্টার মধ্যে পাসপোর্ট নবায়নের আশ্বাস দেন।
বিশ্বাস অর্জনের পর তিনি দাবি করেন, দ্রুত ইতালির ভিসার ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। পরে গুলশানের একটি ট্রাভেল এজেন্সির অফিসে প্রধান আসামি বেলায়েত হোসেনের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে সাড়ে চার লাখ টাকার বিনিময়ে ভিসা করে দেওয়ার মৌখিক চুক্তি হয়।
ভুক্তভোগীর অভিযোগ, ভিসা সংক্রান্ত কাজ শেষ হওয়ার পর তার কাছ থেকে জোরপূর্বক ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা আদায় করা হয়। টাকা দেওয়ার পর তিনি পাসপোর্ট ফিরে পান।
কিন্তু ৯ জুলাই ইতালির উদ্দেশ্যে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গেলে ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে আটকে দেন। সেখানে জানানো হয়, তার পাসপোর্ট ব্যবহার করে গত ২৪ এপ্রিলই অন্য একজন ইতালি ভ্রমণ করেছেন। এরপরই তিনি গুলশান থানায় মামলা দায়ের করেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্টরা এখন খতিয়ে দেখছেন—
- কীভাবে একজনের বৈধ পাসপোর্ট ব্যবহার করে অন্য ব্যক্তি আন্তর্জাতিক ভ্রমণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
- বিমানবন্দর, ইমিগ্রেশন বা ট্রাভেল এজেন্সির কোনো পর্যায়ে জালিয়াত চক্রের সহযোগী ছিল কি না।
- পাসপোর্টে ছবি, বায়োমেট্রিক তথ্য বা ভিসা সংক্রান্ত নথিতে কোনো ধরনের কারসাজি করা হয়েছে কি না।
- এই চক্রের মাধ্যমে আরও কতজন একই ধরনের প্রতারণার শিকার হয়েছেন।
- বিদেশে মানবপাচার বা ভিসা জালিয়াতির সঙ্গে সংঘবদ্ধ আন্তর্জাতিক নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা রয়েছে কি না।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কর্মকর্তারা বলছেন, অন্যের পাসপোর্ট ব্যবহার করে বিদেশে যাওয়া শুধু প্রতারণাই নয়, এটি আন্তর্জাতিক নিরাপত্তার জন্যও বড় হুমকি। এ ধরনের অপরাধে জালিয়াতি, প্রতারণা, মানবপাচার এবং তথ্যপ্রযুক্তি-সংক্রান্ত বিভিন্ন আইনে ব্যবস্থা নেওয়া হতে পারে। তদন্তে অপরাধের ধরন অনুযায়ী নতুন ধারাও যুক্ত হতে পারে।
সিআইডি জানিয়েছে, উদ্ধার হওয়া নথিপত্র, ব্যাংক লেনদেন, মোবাইল ফোনের তথ্য এবং সংশ্লিষ্ট ট্রাভেল এজেন্সির কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে পুরো চক্রের সদস্যদের শনাক্তের কাজ চলছে। প্রয়োজনে আরও গ্রেপ্তার হতে পারে বলেও তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে।



























