ঢাকা ০১:৩৫ পূর্বাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১০ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo লিটন-মেহেদীর শাস্তি নিশ্চিত, এখনো ঠিক হয়নি জরিমানার অঙ্ক Logo তুরস্ক সফর শেষে দেশে ফিরলেন সেনাপ্রধান ওয়াকার-উজ-জামান Logo সরকারবিরোধী মিছিলের অভিযোগে ৫৮ জনের বিরুদ্ধে মামলা Logo আমগাছ কাটার নিয়ে চাঞ্চল্যকর ঘটনাঃরাতের আধারে নবাবগঞ্জে আম বাগান ধ্বংস Logo রাষ্ট্রপতি বাছাইয়ে আগের ভুলের পুনরাবৃত্তি চায় না বিএনপি Logo গ্রিনল্যান্ড হাঙর: অবিশ্বাস্য ৪০০ বছরের জীবনের রহস্য জানুন Logo ফ্যাসিবাদের শিকড় বাহাত্তরের সংবিধানে, দাবি ড. দিলারা চৌধুরীর Logo ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতি হাফিজ উদ্দিনের নতুন দায়িত্ব: বঙ্গভবনে অফিস, স্পিকারের বাসভবনে অবস্থান Logo রান্নাঘর পরিষ্কার রাখার ৭ সহজ ও কার্যকর টিপস Logo সবুজ স্বর্গ নরওয়ে কেন বিদেশি বর্জ্য কিনে আনে?

সবুজ স্বর্গ নরওয়ে কেন বিদেশি বর্জ্য কিনে আনে?

  • ডেস্ক নিউজ
  • Update Time : ১১:৩৪:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬
  • ৫২২

বিদেশি বর্জ্যকে বিদ্যুৎ ও তাপশক্তিতে রূপান্তর করে পরিবেশবান্ধব জ্বালানি উৎপাদন করছে নরওয়ে। ছবি: সংগৃহীত।

বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব দেশ হিসেবে নরওয়ের পরিচিতি দীর্ঘদিনের। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাপক ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন শহর, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং পরিবেশবান্ধব নীতির কারণে দেশটিকে অনেকেই ‘সবুজ স্বর্গ’ বলে থাকেন। তবে এই সবুজ স্বর্গের একটি ব্যতিক্রমী বাস্তবতা রয়েছে। প্রতিবছর বিদেশ থেকে হাজার হাজার টন আবর্জনা আমদানি করে দেশটি। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এই বর্জ্যই নরওয়ের বিদ্যুৎ ও তাপশক্তি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

নরওয়েতে গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানার বর্জ্য অত্যাধুনিক ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্ল্যান্টে নিয়ে উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়। সেই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত তাপ ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় হাজার হাজার বাড়িতে গরম পানি ও উষ্ণতা সরবরাহের জন্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন এবং বর্জ্য কমানোর সফল নীতির কারণে দেশটিতে পোড়ানোর উপযোগী বর্জ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে বিপুল বিনিয়োগে নির্মিত এসব প্ল্যান্ট পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই ঘাটতি পূরণ করতেই যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বর্জ্য আমদানি শুরু করে নরওয়ে।

যুক্তরাজ্যের মতো অনেক দেশে ল্যান্ডফিলে বর্জ্য ফেলা ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই সেখানে জমে থাকা বর্জ্যের একটি অংশ জাহাজে করে পাঠানো হয় নরওয়েতে। নরওয়ে সেই বর্জ্যকে বিদ্যুৎ ও তাপশক্তিতে রূপান্তর করে ব্যবহার করে। অর্থাৎ অন্য দেশের জন্য যে আবর্জনা একটি সমস্যা, সেটিই নরওয়ের কাছে মূল্যবান জ্বালানিতে পরিণত হয়েছে।

তবে এখানেই শেষ নয়। পরিবেশবান্ধব দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও নরওয়ে একই সঙ্গে ইউরোপের অন্যতম বড় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ। দেশের অভ্যন্তরে নতুন বিক্রি হওয়া গাড়ির প্রায় ৯০ শতাংশই বৈদ্যুতিক হওয়ায় কার্বন নিঃসরণ কমেছে। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার এবং তেল রপ্তানি—দুই বাস্তবতাই একই সঙ্গে বহন করছে দেশটি।

সবুজ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুচালিত টারবাইন এবং আধুনিক নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি তৈরিতে ব্যবহৃত লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল ও তামার মতো খনিজের বড় অংশ আসে চিলি, কঙ্গোসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। এসব অঞ্চলে খনিশিল্পের কারণে পরিবেশ দূষণ, পানিসংকট এবং শ্রমিকদের কঠিন কর্মপরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। ফলে উন্নত বিশ্বের সবুজ প্রযুক্তির একটি অংশের পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য পরিশোধ করতে হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোকেই।

এ কারণেই অনেক গবেষক নরওয়েকে ‘গ্রিন প্যারাডক্স’ বা সবুজ বৈপরীত্যের বাস্তব উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। একদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি ও পরিচ্ছন্ন শহর, অন্যদিকে তেল রপ্তানি, বিদেশি বর্জ্য আমদানি এবং বৈশ্বিক খনিজ সরবরাহের ওপর নির্ভরতা—এই দুই বিপরীত বাস্তবতাই একই সঙ্গে বহন করছে দেশটি।

নরওয়ের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, টেকসই উন্নয়ন শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তির পুরো জীবনচক্র, সম্পদ আহরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক পরিবেশগত প্রভাব—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই প্রকৃত অর্থে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। এ কারণেই সবুজ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় নরওয়ের এই মডেল আজ বিশ্বজুড়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।

জনপ্রিয় সংবাদ

লিটন-মেহেদীর শাস্তি নিশ্চিত, এখনো ঠিক হয়নি জরিমানার অঙ্ক

সবুজ স্বর্গ নরওয়ে কেন বিদেশি বর্জ্য কিনে আনে?

Update Time : ১১:৩৪:২৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ জুলাই ২০২৬

বিশ্বের অন্যতম পরিচ্ছন্ন ও পরিবেশবান্ধব দেশ হিসেবে নরওয়ের পরিচিতি দীর্ঘদিনের। বৈদ্যুতিক গাড়ির ব্যাপক ব্যবহার, পরিচ্ছন্ন শহর, নবায়নযোগ্য জ্বালানির প্রসার এবং পরিবেশবান্ধব নীতির কারণে দেশটিকে অনেকেই ‘সবুজ স্বর্গ’ বলে থাকেন। তবে এই সবুজ স্বর্গের একটি ব্যতিক্রমী বাস্তবতা রয়েছে। প্রতিবছর বিদেশ থেকে হাজার হাজার টন আবর্জনা আমদানি করে দেশটি। শুনতে অদ্ভুত লাগলেও, এই বর্জ্যই নরওয়ের বিদ্যুৎ ও তাপশক্তি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

নরওয়েতে গৃহস্থালি ও শিল্পকারখানার বর্জ্য অত্যাধুনিক ওয়েস্ট-টু-এনার্জি প্ল্যান্টে নিয়ে উচ্চ তাপমাত্রায় পোড়ানো হয়। সেই প্রক্রিয়ায় উৎপাদিত তাপ ও বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হয় হাজার হাজার বাড়িতে গরম পানি ও উষ্ণতা সরবরাহের জন্য। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে পুনর্ব্যবহারযোগ্য বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পরিবেশবান্ধব জীবনযাপন এবং বর্জ্য কমানোর সফল নীতির কারণে দেশটিতে পোড়ানোর উপযোগী বর্জ্যের পরিমাণ উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। ফলে বিপুল বিনিয়োগে নির্মিত এসব প্ল্যান্ট পূর্ণ সক্ষমতায় চালানো কঠিন হয়ে পড়ে। এই ঘাটতি পূরণ করতেই যুক্তরাজ্য, আয়ারল্যান্ডসহ ইউরোপের বিভিন্ন দেশ থেকে বর্জ্য আমদানি শুরু করে নরওয়ে।

আরও পড়ুন  দায়িত্বে অবহেলায় ঢাকা সিটির আরও ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর ব্যবস্থা

যুক্তরাজ্যের মতো অনেক দেশে ল্যান্ডফিলে বর্জ্য ফেলা ব্যয়বহুল এবং পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। তাই সেখানে জমে থাকা বর্জ্যের একটি অংশ জাহাজে করে পাঠানো হয় নরওয়েতে। নরওয়ে সেই বর্জ্যকে বিদ্যুৎ ও তাপশক্তিতে রূপান্তর করে ব্যবহার করে। অর্থাৎ অন্য দেশের জন্য যে আবর্জনা একটি সমস্যা, সেটিই নরওয়ের কাছে মূল্যবান জ্বালানিতে পরিণত হয়েছে।

তবে এখানেই শেষ নয়। পরিবেশবান্ধব দেশ হিসেবে পরিচিত হলেও নরওয়ে একই সঙ্গে ইউরোপের অন্যতম বড় তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাস রপ্তানিকারক দেশ। দেশের অভ্যন্তরে নতুন বিক্রি হওয়া গাড়ির প্রায় ৯০ শতাংশই বৈদ্যুতিক হওয়ায় কার্বন নিঃসরণ কমেছে। কিন্তু জাতীয় অর্থনীতির একটি বড় অংশ এখনো জীবাশ্ম জ্বালানি রপ্তানির ওপর নির্ভরশীল। ফলে পরিচ্ছন্ন জ্বালানির ব্যবহার এবং তেল রপ্তানি—দুই বাস্তবতাই একই সঙ্গে বহন করছে দেশটি।

আরও পড়ুন  আইফোন ১৮ প্রো লঞ্চের সম্ভাব্য তারিখ প্রকাশ, সেপ্টেম্বরেই আসছে নতুন আইফোন?

সবুজ প্রযুক্তির ক্ষেত্রেও রয়েছে আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক। বৈদ্যুতিক গাড়ি, বায়ুচালিত টারবাইন এবং আধুনিক নবায়নযোগ্য প্রযুক্তি তৈরিতে ব্যবহৃত লিথিয়াম, কোবাল্ট, নিকেল ও তামার মতো খনিজের বড় অংশ আসে চিলি, কঙ্গোসহ বিভিন্ন দেশ থেকে। এসব অঞ্চলে খনিশিল্পের কারণে পরিবেশ দূষণ, পানিসংকট এবং শ্রমিকদের কঠিন কর্মপরিবেশ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে। ফলে উন্নত বিশ্বের সবুজ প্রযুক্তির একটি অংশের পরিবেশগত ও সামাজিক মূল্য পরিশোধ করতে হয় উন্নয়নশীল দেশগুলোকেই।

আরও পড়ুন  ডিএনসিসির নতুন বাজেট, সড়ক-ড্রেনেজ ও বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় বিশেষ গুরুত্ব

এ কারণেই অনেক গবেষক নরওয়েকে ‘গ্রিন প্যারাডক্স’ বা সবুজ বৈপরীত্যের বাস্তব উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করেন। একদিকে বৈদ্যুতিক গাড়ি, পুনর্ব্যবহারযোগ্য জ্বালানি ও পরিচ্ছন্ন শহর, অন্যদিকে তেল রপ্তানি, বিদেশি বর্জ্য আমদানি এবং বৈশ্বিক খনিজ সরবরাহের ওপর নির্ভরতা—এই দুই বিপরীত বাস্তবতাই একই সঙ্গে বহন করছে দেশটি।

নরওয়ের অভিজ্ঞতা মনে করিয়ে দেয়, টেকসই উন্নয়ন শুধু কার্বন নিঃসরণ কমানোর মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। প্রযুক্তির পুরো জীবনচক্র, সম্পদ আহরণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং বৈশ্বিক পরিবেশগত প্রভাব—সবকিছুকে একসঙ্গে বিবেচনায় নিয়েই প্রকৃত অর্থে টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করা সম্ভব। এ কারণেই সবুজ প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনায় নরওয়ের এই মডেল আজ বিশ্বজুড়ে বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে।