যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নীতিতে বড় পরিবর্তনের ইঙ্গিত মিলছে। অফশোর বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়াতে জার্মান জ্বালানি কোম্পানি আরডব্লিউইকে প্রায় ১.২ বিলিয়ন ডলার দেওয়ার সমঝোতা করেছে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। মার্কিন স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে চুক্তির পর যুক্তরাষ্ট্রের উপকূলে নিজেদের কয়েকটি বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের ইজারা ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত জানিয়েছে আরডব্লিউই। নিউইয়র্ক, ক্যালিফোর্নিয়া ও লুইজিয়ানা উপকূলের এসব প্রকল্প এখন আর এগোবে না। কোম্পানির ভাষ্য, বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব প্রকল্পের অনুমোদন পাওয়ার বাস্তবসম্মত পথ আপাতত দেখা যাচ্ছে না। ফলে নবায়নযোগ্য জ্বালানির একটি সম্ভাবনাময় খাত থেকে যুক্তরাষ্ট্রের সরে যাওয়ার বিষয়টি নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
চুক্তির সবচেয়ে আলোচিত দিক হলো, যুক্তরাষ্ট্র সরকারের কাছ থেকে পাওয়া অর্থের বড় অংশ আবার প্রচলিত জ্বালানি খাতেই বিনিয়োগ করবে আরডব্লিউই। কোম্পানিটি লুইজিয়ানায় একটি এলএনজি রফতানি টার্মিনাল প্রকল্পে প্রায় ৯০০ মিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে। পাশাপাশি গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়ানোর দিকেও নজর দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ সমুদ্রের বাতাস থেকে বিদ্যুৎ উৎপাদনের পরিকল্পনা বাদ দিয়ে একই অর্থের একটি বড় অংশ যাচ্ছে গ্যাস ও এলএনজি খাতে। এ সিদ্ধান্ত শুধু একটি কোম্পানির বিনিয়োগ কৌশল বদলের ঘটনা নয়; বরং যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান জ্বালানি অগ্রাধিকারেরও একটি স্পষ্ট প্রতিফলন। নবায়নযোগ্য জ্বালানির পরিবর্তে প্রচলিত জ্বালানিতে বিনিয়োগ বাড়ানোর প্রবণতা এখন আরও দৃশ্যমান হচ্ছে।
তবে আরডব্লিউই যুক্তরাষ্ট্র থেকে পুরোপুরি বিনিয়োগ গুটিয়ে নিচ্ছে না। বরং আগামী কয়েক বছরে দেশটির বিদ্যুৎ উৎপাদন খাতে বড় অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে কোম্পানিটির। এর মাধ্যমে বোঝা যাচ্ছে, যুক্তরাষ্ট্র এখনও আরডব্লিউইর জন্য গুরুত্বপূর্ণ বাজার; পরিবর্তন হচ্ছে মূলত কোন ধরনের জ্বালানি প্রকল্পে অর্থ দেওয়া হবে, সেই জায়গায়। অফশোর বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পের বদলে গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদন, এলএনজি এবং অন্যান্য প্রচলিত জ্বালানি অবকাঠামোকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ফলে বিনিয়োগকারীদের কাছেও যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি বাজারে নতুন একটি বার্তা যাচ্ছে—সরকারের নীতিগত সমর্থন এখন জীবাশ্ম জ্বালানির দিকেই বেশি ঝুঁকছে।
মার্কিন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডগ বার্গামও এই সমঝোতাকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাঁর বক্তব্য, যুক্তরাষ্ট্রের এমন একটি জ্বালানি ব্যবস্থা প্রয়োজন, যা বাস্তবভিত্তিক হবে এবং ব্যয়বহুল ভর্তুকির ওপর নির্ভরশীল থাকবে না। ট্রাম্প প্রশাসন দীর্ঘদিন ধরেই অফশোর বায়ুবিদ্যুৎ নিয়ে আপত্তি জানিয়ে আসছে। নির্বাচনী প্রচারণা থেকেই ট্রাম্প তেল ও গ্যাস উত্তোলন বাড়ানোর পক্ষে অবস্থান নেন এবং ক্ষমতায় ফেরার পর উইন্ড পাওয়ার প্রকল্প সীমিত করার উদ্যোগ নেন। প্রশাসনের যুক্তি, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা ও নির্ভরযোগ্যতা নিশ্চিত করতে প্রচলিত জ্বালানি গুরুত্বপূর্ণ। অন্যদিকে সমালোচকদের মতে, নবায়নযোগ্য জ্বালানি প্রকল্প বন্ধ করার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে পরিচ্ছন্ন জ্বালানি রূপান্তরের সুযোগ হারাতে পারে।
আরডব্লিউইর সঙ্গে চুক্তিটি অবশ্য যুক্তরাষ্ট্রে এ ধরনের প্রথম ঘটনা নয়। এর আগে ফরাসি জ্বালানি কোম্পানি টোটালএনার্জিসসহ আরও কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অফশোর প্রকল্প বাতিল বা ইজারা ছাড়ার বিষয়ে প্রশাসনের সঙ্গে সমঝোতা হয়েছে। একই ধরনের চুক্তিতে কিছু কোম্পানি তাদের বিনিয়োগ এলএনজি, গ্যাস ও তেল প্রকল্পের দিকে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ফলে একের পর এক প্রকল্প বাতিলের ঘটনায় যুক্তরাষ্ট্রের অফশোর বায়ুবিদ্যুৎ খাতের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। বিশেষ করে যেসব প্রকল্প এখনও নির্মাণ পর্যায়ে যায়নি, সেগুলোর ক্ষেত্রে সরকারি অনুমোদন ও নীতিগত সহায়তা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ছে। এতে নতুন বিনিয়োগকারীদের সিদ্ধান্তেও প্রভাব পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে আরডব্লিউইর সঙ্গে এই সমঝোতা যুক্তরাষ্ট্রের জ্বালানি নীতির পরিবর্তনকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। একদিকে সরকার তেল, গ্যাস ও এলএনজিকে জ্বালানি নিরাপত্তার গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হিসেবে দেখছে, অন্যদিকে অফশোর বায়ুবিদ্যুৎ প্রকল্পগুলো ক্রমেই অনিশ্চয়তার মুখে পড়ছে। ফলে যুক্তরাষ্ট্রে নবায়নযোগ্য জ্বালানির ভবিষ্যৎ বিনিয়োগ কতটা দ্রুত এগোবে, তা নিয়ে নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে। আরডব্লিউইর সিদ্ধান্তও দেখাচ্ছে, নীতিগত পরিবেশ বদলে গেলে বড় আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো তাদের বিনিয়োগের দিক দ্রুত পরিবর্তন করতে পারে। তাই এই চুক্তি শুধু একটি প্রকল্প বাতিলের খবর নয়; বরং বিশ্বের অন্যতম বড় অর্থনীতির জ্বালানি কৌশলে কোন পথে এগোনোর চেষ্টা চলছে, তারও গুরুত্বপূর্ণ ইঙ্গিত।




























