কুয়াশায় ঢাকা পাহাড়ি বাঁশবনের ভেতর নীরবে ঘুরে বেড়ায় কালো-সাদা এক প্রাণী। শান্ত স্বভাব, গোল মুখ আর চোখের চারপাশের কালো দাগের কারণে পৃথিবীর সবচেয়ে পরিচিত বন্যপ্রাণীদের একটি হয়ে উঠেছে জায়ান্ট পান্ডা।
তবে এই প্রাণীর একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো এর ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা। পৃথিবীর অন্য অনেক দেশেও উপযুক্ত পাহাড়ি বন ও সংরক্ষিত এলাকা থাকলেও বন্য জায়ান্ট পান্ডার স্বাভাবিক আবাস এখন শুধু চীনে।
কেন এমন হলো? এর পেছনে রয়েছে দীর্ঘ বিবর্তন, জলবায়ু, বাঁশের ওপর নির্ভরতা এবং মানুষের কারণে আবাসস্থল হারানোর ইতিহাস।
জায়ান্ট পান্ডা দেখতে কেমন
জায়ান্ট পান্ডা ভালুক পরিবারের সদস্য। পূর্ণবয়স্ক একটি পান্ডার দৈর্ঘ্য প্রায় দেড় মিটার এবং কাঁধ পর্যন্ত উচ্চতা প্রায় ৯০ সেন্টিমিটার হতে পারে। ওজন সর্বোচ্চ প্রায় ১৫০ কেজি পর্যন্ত হতে পারে।
পুরুষ পান্ডা সাধারণত স্ত্রী পান্ডার তুলনায় কিছুটা বড় ও ভারী হয়। শরীরের ঘন সাদা লোমের ওপর চোখ, কান, কাঁধ ও পায়ের চারপাশে কালো লোম তাদের পরিচিত চেহারা তৈরি করেছে।
তবে জন্মের সময় পান্ডার চেহারা একেবারেই ভিন্ন। নবজাতক শাবক মায়ের তুলনায় অত্যন্ত ছোট এবং প্রায় একটি ভুট্টার মোচার আকারের মতো হতে পারে।
বাঁশের ওপর এতটা নির্ভরশীল কেন
পান্ডার পরিপাকতন্ত্র মূলত মাংসাশী প্রাণীর মতো হলেও বিবর্তনের ফলে তাদের খাদ্যাভ্যাস প্রায় পুরোপুরি তৃণভোজী হয়ে গেছে। তাদের খাদ্যের প্রধান অংশই বাঁশ।
একটি জায়ান্ট পান্ডাকে প্রতিদিন প্রায় ১২ থেকে ৩৮ কেজি পর্যন্ত বাঁশ খেতে হতে পারে। বাঁশে পুষ্টির পরিমাণ তুলনামূলক কম এবং এর বড় অংশই সহজে হজম হয় না। এ কারণেই পান্ডাকে দিনের দীর্ঘ সময় খাবার খেতে হয়।
তারা দিনে বহুবার মলত্যাগও করে। তবে বাঁশই তাদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতার কারণ। কারণ বাঁশবন নষ্ট হলে পান্ডার খাবারের প্রধান উৎসও হারিয়ে যায়।
বাঁশের পাশাপাশি অল্প পরিমাণে অন্য উদ্ভিদ এবং কখনো কখনো ছোট প্রাণীও তারা খেতে পারে। বাঁশ আঁকড়ে ধরার জন্য তাদের কবজির একটি বিশেষ হাড় আঙুলের মতো কাজ করে।
কেন প্রাকৃতিকভাবে শুধু চীনেই পান্ডা আছে
সবসময় কিন্তু জায়ান্ট পান্ডার বিস্তৃতি শুধু বর্তমান চীনের ভূখণ্ডে সীমাবদ্ধ ছিল না। অতীতে দক্ষিণ ও পূর্ব চীনের আরও বিস্তৃত অঞ্চল ছাড়িয়ে মিয়ানমার ও উত্তর ভিয়েতনাম পর্যন্ত তাদের বিচরণ ছিল বলে জানা যায়।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে মানুষের জনসংখ্যা বৃদ্ধি, কৃষিকাজ ও বসতি সম্প্রসারণের কারণে পান্ডার প্রাকৃতিক আবাসস্থল সংকুচিত হতে থাকে। বিস্তৃত বনভূমি ভেঙে ছোট ছোট অংশে পরিণত হয়।
শেষ পর্যন্ত পান্ডারা টিকে থাকে চীনের দুর্গম পাহাড়ি বনাঞ্চলে। এসব এলাকায় বাঁশের পর্যাপ্ত সরবরাহ, তুলনামূলক শীতল আবহাওয়া এবং মানুষের উপস্থিতি কম থাকায় পান্ডার জন্য উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি হয়।
বর্তমানে বন্য জায়ান্ট পান্ডার আবাস চীনের সিচুয়ান, শানশি ও গানসু প্রদেশের কয়েকটি পাহাড়ি অঞ্চলে সীমাবদ্ধ। তাদের একটি বড় অংশ মিনশান ও চিনলিং পর্বতমালায় বাস করে।
বাঁশের বৈচিত্র্যেও চীনের সুবিধা
পান্ডার টিকে থাকার সঙ্গে বাঁশের সম্পর্ক এতটাই গভীর যে কোন অঞ্চলে পান্ডা থাকতে পারবে, তা নির্ধারণে বাঁশের উপস্থিতি গুরুত্বপূর্ণ।
চীনের পাহাড়ি বনাঞ্চলে বাঁশের বিভিন্ন প্রজাতি ও বৈচিত্র্য রয়েছে। ফলে পান্ডারা বিভিন্ন মৌসুমে বিভিন্ন ধরনের বাঁশ থেকে খাবার সংগ্রহ করতে পারে।
এ ছাড়া পান্ডা তুলনামূলক ঠান্ডা পরিবেশ পছন্দ করে। চীনের উঁচু পাহাড়, কুয়াশাচ্ছন্ন উপত্যকা ও শীতল বনাঞ্চল তাদের জীবনযাপনের জন্য উপযোগী পরিবেশ তৈরি করেছে।
কীভাবে বিলুপ্তির মুখ থেকে ফিরে এলো পান্ডা
একসময় জায়ান্ট পান্ডার সংখ্যা দ্রুত কমে যাচ্ছিল। মানুষের বসতি ও কৃষিকাজের বিস্তারের পাশাপাশি বনভূমি ধ্বংস হওয়ায় তাদের আবাসস্থল ক্রমেই ছোট হয়ে আসে।
বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে চীন পান্ডা সংরক্ষণে কঠোর পদক্ষেপ নিতে শুরু করে। পান্ডার জন্য সংরক্ষিত এলাকা তৈরি করা হয় এবং শিকার নিষিদ্ধ করা হয়।
পরবর্তী সময়ে আরও বড় পরিসরে আবাসস্থল সংরক্ষণ ও পুনরুদ্ধারের উদ্যোগ নেওয়া হয়। বিচ্ছিন্ন বনাঞ্চলের মধ্যে যোগাযোগ তৈরি করতে বাঁশ করিডোরও গড়ে তোলা হয়েছে। এর ফলে পান্ডারা এক বনাঞ্চল থেকে অন্য এলাকায় যেতে এবং খাবার ও প্রজননসঙ্গী খুঁজে পাওয়ার সুযোগ পায়।
সংরক্ষণ উদ্যোগের ফলও ধীরে ধীরে দেখা যায়। ২০০৪ সালের জরিপে চীনের বনে প্রায় ১ হাজার ৬০০টি জায়ান্ট পান্ডার সন্ধান পাওয়া গিয়েছিল। ২০১৪ সালের জরিপে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ হাজার ৮৬৪টিতে।
চিড়িয়াখানা ও সংরক্ষণকেন্দ্র মিলিয়ে এর বাইরে আরও কয়েকশ পান্ডা রয়েছে।
পান্ডার সংখ্যা গণনা করাও কঠিন কাজ
বনের মধ্যে ঠিক কতগুলো পান্ডা রয়েছে, তা নির্ধারণ করা সহজ নয়। দুর্গম পাহাড়ি বাঁশবনে গবেষকদের দীর্ঘ সময় ধরে অনুসন্ধান চালাতে হয়।
পান্ডার মলও গবেষণায় গুরুত্বপূর্ণ সূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হয়। মলের মধ্যে থাকা অপাচ্য বাঁশের অংশ পরীক্ষা করে পান্ডার উপস্থিতি সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়।
পান্ডার দাঁতের কামড়ের চিহ্নও শনাক্তকরণে সহায়তা করতে পারে। প্রতিটি পান্ডার কামড়ের ধরন কিছুটা আলাদা হওয়ায় গবেষকেরা এসব চিহ্ন ব্যবহার করে বিভিন্ন পান্ডাকে আলাদা করে শনাক্ত করার চেষ্টা করেন।
পান্ডা যখন চীনের কূটনীতির অংশ
পান্ডার গল্প শুধু বন্যপ্রাণী সংরক্ষণে সীমাবদ্ধ নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে আন্তর্জাতিক কূটনীতিও।
চীন দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন দেশের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নে জায়ান্ট পান্ডাকে শুভেচ্ছার প্রতীক হিসেবে ব্যবহার করেছে। ১৯৫৭ থেকে ১৯৮৩ সাল পর্যন্ত বিভিন্ন দেশকে ২৪টি পান্ডা উপহার দেওয়ার তথ্য পাওয়া যায়।
এই প্রথাই পরে ‘পান্ডা ডিপ্লোম্যাসি’ নামে পরিচিত হয়ে ওঠে।
তবে আশির দশকে চীন পান্ডাকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে বিবেচনা করে বিদেশে স্থায়ীভাবে উপহার দেওয়ার পরিবর্তে ধার দেওয়ার ব্যবস্থা চালু করে।
বিদেশের পান্ডার মালিক কে
বর্তমানে বিদেশের চিড়িয়াখানায় থাকা জায়ান্ট পান্ডাগুলোর ক্ষেত্রেও মালিকানা চীনের কাছেই থাকে। অর্থাৎ কোনো দেশ চীনের কাছ থেকে পান্ডা ধার নিলে প্রাণীটির আইনগত মালিকানা তাদের কাছে চলে যায় না।
এমনকি বিদেশে জন্ম নেওয়া পান্ডা শাবকের ক্ষেত্রেও চীনের মালিকানা বজায় থাকে।
পান্ডা ধার নেওয়ার জন্য চিড়িয়াখানাগুলোকে নির্দিষ্ট শর্ত পূরণ করতে হয়। পাশাপাশি পান্ডার খাবার, চিকিৎসা ও পরিচর্যার খরচও অনেক বেশি।
সাধারণত এসব চুক্তির মেয়াদ কয়েক বছর থাকে এবং নির্দিষ্ট শর্তে তা বাড়ানো যেতে পারে।
পান্ডা কেন চীনের প্রতীক হয়ে উঠেছে
পান্ডার প্রাকৃতিক আবাস চীনের পাহাড়ি বনাঞ্চলে সীমাবদ্ধ থাকার পাশাপাশি দেশটির সংস্কৃতিতেও প্রাণীটির বিশেষ অবস্থান তৈরি হয়েছে।
বিলুপ্তির ঝুঁকি থেকে পান্ডাকে ফিরিয়ে আনতে দীর্ঘদিনের সংরক্ষণ উদ্যোগ, আবাসস্থল রক্ষা এবং প্রজনন কর্মসূচি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
আজও বন্য জায়ান্ট পান্ডার অস্তিত্ব চীনের নির্দিষ্ট কিছু পাহাড়ি বনাঞ্চলের সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই পৃথিবীর অন্য কোথাও উপযুক্ত পরিবেশ তৈরি করলেই যে প্রাকৃতিকভাবে পান্ডার আবাস গড়ে উঠবে, বিষয়টি এত সরল নয়। তাদের খাদ্য, জলবায়ু, বনভূমির গঠন এবং দীর্ঘ বিবর্তন—সবকিছু মিলিয়েই চীনের পাহাড়ি অঞ্চল তাদের বর্তমান প্রাকৃতিক আবাসে পরিণত হয়েছে।


























