রাজধানীর পল্লবীতে সাত বছরের এক শিশুকে নৃশংসভাবে হত্যার ঘটনায় জড়িতদের দ্রুত বিচার দাবিতে বিক্ষোভ সমাবেশ করেছে ধর্ষণবিরোধী নাগরিক নেটওয়ার্ক। শুক্রবার বিকেল সাড়ে চারটায় কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে আয়োজিত এ কর্মসূচিতে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও নাগরিক সংগঠনের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। বক্তারা বলেন, দেশের চলমান ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিচার দ্রুত নিশ্চিত না হওয়ায় অপরাধীরা আরও বেপরোয়া হয়ে উঠছে।
সমাবেশে অংশ নেওয়া বক্তারা পল্লবীর শিশুহত্যাকে শুধু একটি বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, বরং দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির একটি ভয়াবহ প্রতিচ্ছবি হিসেবে উল্লেখ করেন। তারা বলেন, শিশু ও নারীদের বিরুদ্ধে সহিংসতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে চলেছে। অথচ বিচারহীনতার সংস্কৃতি অপরাধীদের উৎসাহিত করছে।
বিক্ষোভ সমাবেশে অংশগ্রহণকারীরা হত্যাকাণ্ডের সঙ্গে জড়িতদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানান। একই সঙ্গে নারী ও শিশু নির্যাতনের মামলাগুলোর বিচার প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল সক্রিয় করার আহ্বান জানান তারা। অনেকেই শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সামাজিক ও প্রশাসনিক উদ্যোগ জোরদারের দাবি তোলেন।
ধর্ষণবিরোধী নাগরিক নেটওয়ার্কের সভাপতি এবং জাতীয় নাগরিক পার্টি নেত্রী মনিরা শারমিন সমাবেশে বক্তব্য দেন। তিনি বলেন, ধর্ষণ ও হত্যাকাণ্ডের বিরুদ্ধে সমাজের সব স্তরের মানুষকে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে আন্দোলন করলে কাঙ্ক্ষিত চাপ তৈরি করা সম্ভব হয় না বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
মনিরা শারমিন বলেন, একটি সম্মিলিত জাতীয় প্ল্যাটফর্ম তৈরি করে যদি সবাই একই দাবিতে সোচ্চার হতে পারতেন, তাহলে সরকারের ওপর আরও কার্যকর চাপ সৃষ্টি করা যেত। তিনি অভিযোগ করেন, অনেক সময় রাজনৈতিক বিভাজনের কারণে মানবিক বিষয়েও ঐক্যবদ্ধ অবস্থান তৈরি হয় না। এর ফলে অপরাধীদের বিরুদ্ধে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে ওঠে না।
সমাবেশে সংহতি জানিয়ে ন্যাশনাল আইডিয়াল গার্লস কলেজের প্রভাষক ফারজানা আহমেদ বলেন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেক ধর্ষণ ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা লোকচক্ষুর আড়ালেই থেকে যায়। বিশেষ করে গ্রামাঞ্চল ও চরাঞ্চলের ভুক্তভোগীরা ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হন। এসব ঘটনায় মামলা হলেও বিচার দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে যায় বলে তিনি উল্লেখ করেন।
ফারজানা আহমেদ বলেন, শুধু আইন প্রণয়ন করলেই হবে না, সেই আইনের যথাযথ বাস্তবায়ন নিশ্চিত করাও জরুরি। বিচার প্রক্রিয়া দীর্ঘ হলে ভুক্তভোগী পরিবার মানসিকভাবে ভেঙে পড়ে। একই সঙ্গে অপরাধীদের মধ্যেও আইনের ভয় কমে যায়।
সমাবেশে উপস্থিত বিভিন্ন নাগরিক সংগঠনের নেতারা বলেন, শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও স্থানীয় প্রশাসনকে আরও দায়িত্বশীল হতে হবে। শিশুদের প্রতি সহিংসতার ঘটনায় দ্রুত তদন্ত এবং কার্যকর বিচার নিশ্চিত করতে হবে। পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বাড়ানোর ওপরও গুরুত্বারোপ করেন তারা।
এর আগে গত ১৯ মে রাতে পল্লবী থানায় ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগে তিনজনকে আসামি করে মামলা করেন নিহত শিশুর বাবা। মামলায় উল্লেখ করা হয়, শিশুটিকে পরিকল্পিতভাবে নির্যাতনের পর হত্যা করা হয়েছে। ঘটনার পর এলাকায় ব্যাপক ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, ঘটনার তদন্ত চলছে এবং অভিযুক্তদের শনাক্ত ও গ্রেপ্তারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে। তদন্ত সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, হত্যাকাণ্ডের সব দিক গুরুত্ব দিয়ে দেখা হচ্ছে। প্রযুক্তিগত তথ্য সংগ্রহের পাশাপাশি প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্যও নেওয়া হচ্ছে।
সমাবেশে অংশ নেওয়া নিহত শিশুর প্রতিবেশী রেহানা আক্তার রুমা ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তিনি বলেন, ঘটনার পর থেকে তিনি মানসিকভাবে স্বাভাবিক থাকতে পারছেন না। নিহত শিশুর পরিবারের পাশে থেকে তিনি পুরো পরিস্থিতি কাছ থেকে দেখেছেন।
রেহানা আক্তার বলেন, শিশুটির মরদেহের অবস্থা এতটাই ভয়াবহ ছিল যে এখনো চোখ বন্ধ করলে সেই দৃশ্য ভেসে ওঠে। তিনি দাবি করেন, এ হত্যাকাণ্ড কোনো আকস্মিক ঘটনা নয়, বরং পরিকল্পিত ও বিকৃত মানসিকতার বহিঃপ্রকাশ। এমন অপরাধীদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি জানান তিনি।
তিনি আরও বলেন, সমাজে অপরাধীদের সামাজিকভাবে চিহ্নিত ও বয়কট করার সংস্কৃতি তৈরি করতে হবে। ভুক্তভোগীদের ছবি বা পরিচয় প্রকাশ না করে অপরাধীদের পরিচয় বেশি করে সামনে আনার আহ্বান জানান তিনি। এতে ভবিষ্যতে অপরাধীরা সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন হবে বলে মত দেন তিনি।
সমাবেশে বক্তারা বলেন, দেশে নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনা দিন দিন বাড়ছে, যা উদ্বেগজনক। অনেক ক্ষেত্রে প্রভাবশালী মহলের কারণে বিচার প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়। ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে হতাশা তৈরি হচ্ছে।
তারা আরও বলেন, বিচারহীনতার সংস্কৃতি বন্ধ করতে হলে তদন্ত থেকে শুরু করে আদালতের কার্যক্রম পর্যন্ত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী পরিবারকে আইনি ও মানসিক সহায়তা দেওয়ার জন্য সরকারি উদ্যোগ বাড়ানোর দাবি জানান বক্তারা।
সমাবেশে বক্তব্য দেন জাতীয় নাগরিক পার্টির ঢাকা মহানগর উত্তরের যুগ্ম আহ্বায়ক তারেক রহমান আদেল। তিনি বলেন, নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব। এ দায়িত্ব পালনে ব্যর্থ হলে জনগণের আস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী জসীম নায়েদ বলেন, ধর্ষণ ও হত্যার মামলাগুলোতে দ্রুত বিচার নিশ্চিত করতে বিশেষ ট্রাইব্যুনালের কার্যক্রম আরও শক্তিশালী করা প্রয়োজন। অনেক সময় মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ ও তদন্তে দীর্ঘ সময় লাগার কারণে বিচার বিলম্বিত হয়। এতে ন্যায়বিচার বাধাগ্রস্ত হয় বলে মন্তব্য করেন তিনি।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাদিয়া রহমান অন্বেষা বলেন, শিশু ও নারীর নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে শুধু আইন নয়, সামাজিক মনোভাবেরও পরিবর্তন প্রয়োজন। পরিবার থেকে শুরু করে শিক্ষা প্রতিষ্ঠান পর্যন্ত সচেতনতা বাড়াতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে মানবিক মূল্যবোধে গড়ে তোলার ওপরও জোর দেন তিনি।
সমাবেশ শেষে অংশগ্রহণকারীরা দ্রুত বিচারের দাবিতে বিভিন্ন স্লোগান দেন। তারা বলেন, এ ধরনের নৃশংস ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঠেকাতে এখনই কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় সমাজে নিরাপত্তাহীনতা আরও বাড়বে।
বিক্ষোভকারীরা সরকারকে কঠোর অবস্থান নেওয়ার আহ্বান জানিয়ে বলেন, নারী ও শিশু নির্যাতনের ঘটনায় কোনো ধরনের রাজনৈতিক বা সামাজিক প্রভাব যেন কাজ না করে। অপরাধী যেই হোক, তাকে আইনের আওতায় এনে দ্রুত শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে।
সমাবেশ থেকে ভবিষ্যতেও এ ধরনের আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দেওয়া হয়। আয়োজকরা জানান, পল্লবীর শিশুহত্যার বিচার নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত তারা বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করবেন। একই সঙ্গে দেশজুড়ে নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধে সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তোলার আহ্বান জানান তারা।























