সীতাকুণ্ডে এবার ঈদুল আজহার পর সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছে চামড়ার বাজারে ধস। প্রতিবছরের মতো বিভিন্ন কওমি মাদ্রাসা, হাফেজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানা কোরবানির পশুর চামড়া সংগ্রহ করলেও এবার সেই চামড়া বিক্রি নিয়ে চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে পড়েছে প্রতিষ্ঠানগুলো। বাজারে ক্রেতা সংকট, কম দাম, শ্রমিকের অভাব এবং সংরক্ষণ ব্যয় বৃদ্ধির কারণে অনেক মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ এখন বড় ধরনের আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা করছেন।
সংশ্লিষ্টদের মতে, কোরবানির পশুর চামড়া দীর্ঘদিন ধরে কওমি মাদ্রাসা ও এতিমখানার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আয়ের উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়ে আসছে। চামড়া বিক্রির অর্থ দিয়ে এতিম ও অসহায় শিক্ষার্থীদের খাদ্য, পোশাক, আবাসন এবং শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়। কিন্তু কয়েক বছর ধরে চামড়া খাতে চলমান অস্থিরতার কারণে সেই আয়ের উৎস ক্রমেই সংকুচিত হয়ে যাচ্ছে। স্থানীয় মাদ্রাসা কর্তৃপক্ষ জানান, একটি চামড়া সংগ্রহ করতে পরিবহন, শ্রমিক ও অন্যান্য খাতে উল্লেখযোগ্য ব্যয় করতে হয়। এরপর চামড়া সংরক্ষণের জন্য লবণ ব্যবহার করতে হয়, যার খরচও কম নয়। কিন্তু বাজারে যে দাম পাওয়া যাচ্ছে, তা অনেক ক্ষেত্রেই খরচের সমান বা তার চেয়েও কম।
সীতাকুণ্ড পৌরসভার ৫ নম্বর ওয়ার্ডে অবস্থিত তাহফিজুল কোরআন মাদ্রাসা ও এতিমখানার প্রিন্সিপাল ইলিয়াস হুজুর জানান, প্রতিটি চামড়া সংগ্রহে প্রায় ১৩০ টাকা ব্যয় হয়। পরে লবণ দিয়ে সংরক্ষণ করতে আরও প্রায় ২০০ টাকা খরচ হয়। সব মিলিয়ে একটি চামড়ার পেছনে প্রায় সাড়ে তিনশ টাকা পর্যন্ত ব্যয় পড়ে। তিনি বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪০০টি চামড়া সংগ্রহ করেছে। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দুই টন লবণ দেওয়া হলেও প্রয়োজনীয় জনবল না থাকায় সব চামড়ায় যথাসময়ে লবণ দেওয়া সম্ভব হয়নি। বাজারে রাত পর্যন্ত অপেক্ষা করেও কোনো ক্রেতা পাওয়া যায়নি। ফলে চামড়াগুলো সংরক্ষণ ও বিক্রি নিয়ে তারা চরম সংকটে পড়েছেন।
একই ধরনের পরিস্থিতির কথা জানিয়েছেন ফকিরহাট পূর্ব মুরাদপুর এলাকার মহিউস সুন্নাহ মডেল মাদ্রাসা ও এতিমখানার শিক্ষক মাওলানা মোহাম্মদ আনোয়ার হোসাইন। তিনি বলেন, তাদের প্রতিষ্ঠান প্রায় ৭০টি চামড়া সংগ্রহ করেছে। কিন্তু এখন পর্যন্ত সেগুলো বিক্রি করা সম্ভব হয়নি। এতে একদিকে যেমন আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা রয়েছে, অন্যদিকে চামড়া নষ্ট হয়ে যাওয়ার ভয়ও তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে ইসলামিয়া আরাবিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার সিনিয়র মুহাদ্দিস মাওলানা জসিম উদ্দিন জানান, তারা সীতাকুণ্ড পৌরসভা ও আশপাশের বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে প্রায় এক হাজার চামড়া সংগ্রহ করেছিলেন। কিন্তু বাজারে কাঙ্ক্ষিত দাম না পাওয়ায় শেষ পর্যন্ত প্রতি পিস মাত্র ২০০ টাকায় বিক্রি করতে বাধ্য হয়েছেন।
তিনি আরও বলেন, চট্টগ্রাম শহরের কয়েকজন বড় ব্যবসায়ীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও সাড়া মেলেনি। পরে স্থানীয় এক চামড়া ব্যবসায়ীর কাছে কম দামে চামড়াগুলো বিক্রি করতে হয়। এই অর্থ সাধারণত এতিম শিক্ষার্থীদের কল্যাণ তহবিলে ব্যয় করা হয়। কিন্তু এবার প্রত্যাশিত আয় না হওয়ায় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানটির আর্থিক পরিকল্পনায় প্রভাব পড়তে পারে। সীতাকুণ্ড উপজেলা প্রশাসনের হিসাব অনুযায়ী, চামড়া সংরক্ষণের জন্য বিভিন্ন মাদ্রাসায় মোট ২৫ টন লবণ বিতরণ করা হয়েছে। পৌরসভার তিনটি এবং বাঁশবাড়িয়া এলাকার একটি মাদ্রাসাসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে এই সহায়তা দেওয়া হয়। এসব প্রতিষ্ঠানে কয়েকশ থেকে শুরু করে দেড় হাজারেরও বেশি চামড়া সংগ্রহ করা হয়েছে।
স্থানীয়দের মতে, চামড়া সংগ্রহের পর দ্রুত বিক্রির ব্যবস্থা না থাকায় প্রতি বছরই অনেক প্রতিষ্ঠান সমস্যায় পড়ে। বিশেষ করে ঈদের সময় একসঙ্গে বিপুল পরিমাণ চামড়া বাজারে আসায় ক্রেতারা কম দামে চামড়া কিনতে চান। ফলে সংগ্রাহক প্রতিষ্ঠানগুলো দর-কষাকষিতে দুর্বল অবস্থানে চলে যায়। চামড়া ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিরা বলছেন, ট্যানারিগুলোর সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের সুযোগ না থাকায় মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো মধ্যস্বত্বভোগীদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত হতে হয়। একই সঙ্গে সংরক্ষণ ও পরিবহন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতাও সমস্যাকে আরও জটিল করে তোলে।
শিক্ষক ও মাদ্রাসা পরিচালনা কমিটির সদস্যরা মনে করেন, শুধু লবণ বিতরণ করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। সরকারিভাবে দ্রুত চামড়া সংগ্রহ, ন্যায্যমূল্য নিশ্চিতকরণ, সংরক্ষণ ব্যবস্থার উন্নয়ন এবং ট্যানারিগুলোর সঙ্গে সরাসরি সমন্বয় গড়ে তোলা জরুরি। অন্যথায় ভবিষ্যতে অনেক প্রতিষ্ঠান চামড়া সংগ্রহে আগ্রহ হারিয়ে ফেলতে পারে। বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের চামড়া শিল্পকে টিকিয়ে রাখতে হলে কোরবানির মৌসুমে একটি কার্যকর সংগ্রহ ও বিপণন ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে একদিকে যেমন মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলো ন্যায্য মূল্য পাবে, অন্যদিকে দেশের চামড়া শিল্পও নতুন করে গতি ফিরে পাবে।
বর্তমান পরিস্থিতিতে সীতাকুণ্ডের মাদ্রাসা ও এতিমখানাগুলোর প্রধান উদ্বেগ হলো সংগ্রহ করা চামড়াগুলো যাতে নষ্ট না হয় এবং অন্তত ব্যয় মেটানোর মতো মূল্য পাওয়া যায়। কিন্তু বাজার পরিস্থিতি পরিবর্তন না হলে তাদের এই উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।






















