সুইজারল্যান্ডে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের কর্মকর্তারা গুরুত্বপূর্ণ অগ্রগতি অর্জন করেছেন বলে জানিয়েছেন মধ্যস্থতাকারীরা। যুদ্ধ বন্ধ এবং দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার লক্ষ্যে উভয় পক্ষ ৬০ দিনের একটি রোডম্যাপ নিয়ে কাজ করতে সম্মত হয়েছে। তবে লেবাননের পরিস্থিতি এবং হরমুজ প্রণালীকে ঘিরে উত্তেজনা এখনো পুরোপুরি দূর হয়নি।
সোমবার সুইজারল্যান্ডের বুয়েরগেনস্টক রিসোর্টে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক নির্ধারিত সময়ের আগেই শেষ হয়। আলোচনায় মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে পাকিস্তান ও কাতার। যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, উভয় পক্ষ একটি চূড়ান্ত চুক্তির দিকে এগিয়ে যাওয়ার বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থান নিয়েছে।
আলোচনার শুরুটা ছিল বেশ উত্তেজনাপূর্ণ। এর আগে ইরান আবারও হরমুজ প্রণালী বন্ধ করে দেয় এবং মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন হামলার হুমকি দেন। ফলে বৈঠকের পরিবেশ শুরুতে অনিশ্চয়তায় ভরা ছিল।
তবে দীর্ঘ আলোচনা শেষে উভয় পক্ষ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে সমঝোতার ভিত্তি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে। বিশেষ করে ইসরায়েল ও ইরান-সমর্থিত হিজবুল্লাহর মধ্যে সংঘাত কমানোর বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। পাশাপাশি হরমুজ প্রণালী দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচল নিরাপদ রাখার বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে।
যৌথ বিবৃতিতে বলা হয়েছে, সপ্তাহজুড়ে কারিগরি পর্যায়ের আলোচনা চলবে। এসব বৈঠকে যুদ্ধবিরতি, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, জ্বালানি সরবরাহ এবং পারমাণবিক ইস্যুসহ বিভিন্ন বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে। মধ্যস্থতাকারীরা আশা করছেন, এসব আলোচনা স্থায়ী সমাধানের পথ তৈরি করবে।
ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাগচি আলোচনাকে ইতিবাচক হিসেবে বর্ণনা করেছেন। তিনি দাবি করেন, ইরান তেল ও পেট্রোকেমিক্যাল রপ্তানির ক্ষেত্রে কিছু ছাড় পেয়েছে। পাশাপাশি স্থগিত থাকা কিছু সম্পদ মুক্ত করার বিষয়েও অগ্রগতি হয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত শুরুর পর থেকে বৈশ্বিক জ্বালানি বাজার ব্যাপক অস্থিরতার মধ্যে ছিল। হরমুজ প্রণালী অবরোধের কারণে তেলের দাম দ্রুত বেড়ে যায়। তবে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের অন্তর্বর্তী সমঝোতার পর পরিস্থিতি কিছুটা স্বাভাবিক হতে শুরু করেছে।
সোমবারের যৌথ বিবৃতির পর আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম আরও কমেছে। সরবরাহ সংকটের আশঙ্কা কমে যাওয়ায় বিনিয়োগকারীদের মধ্যে স্বস্তি ফিরেছে। ব্রেন্ট ক্রুডের দামও ব্যারেলপ্রতি ৮০ ডলারের নিচে নেমে এসেছে।
আলোচনায় মার্কিন প্রতিনিধি দলের নেতৃত্ব দেন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্স। তিনি রবিবার ইরানি কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক শুরু করেন এবং আলোচনা সোমবার ভোর পর্যন্ত চলে। ভ্যান্স বলেন, সংঘাত বন্ধের পথে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে।
তবে ট্রাম্পের কিছু বক্তব্য নতুন করে উত্তেজনা সৃষ্টি করে। তিনি সতর্ক করে বলেন, ইরান আবার হরমুজ প্রণালী বন্ধ করার চেষ্টা করলে কঠোর পরিণতি ভোগ করতে হবে। এমনকি যুক্তরাষ্ট্র ওই জলপথের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কথাও বিবেচনা করতে পারে বলে ইঙ্গিত দেন।
ইরানের আধা-সরকারি বার্তা সংস্থা তাসনিম দাবি করেছে, ট্রাম্পের মন্তব্যের পর ইরানি প্রতিনিধিদল ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া দেখায়। যদিও মার্কিন পক্ষের দাবি, ইরানি কর্মকর্তারা বৈঠক ত্যাগ করেননি এবং গভীর রাত পর্যন্ত আলোচনা চালিয়ে গেছেন।
চুক্তির অন্যতম লক্ষ্য হলো হরমুজ প্রণালী পুরোপুরি খুলে দেওয়া এবং সব ধরনের শত্রুতামূলক কর্মকাণ্ড বন্ধ করা। এর মধ্যে লেবাননের সংঘাতও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। তবে এ বিষয়ে এখনো পুরোপুরি ঐকমত্য হয়নি।
এদিকে ইসরায়েলের প্রেসিডেন্ট আইজ্যাক হারজগ বলেছেন, কূটনৈতিক সমাধানের বিরোধিতা করে না ইসরায়েল। তবে যেকোনো চুক্তি এমন হতে হবে যাতে ইরান প্রাপ্ত অর্থ সামরিক কর্মকাণ্ড বা আঞ্চলিক মিত্র গোষ্ঠীগুলোকে সহায়তার জন্য ব্যবহার করতে না পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, সুইজারল্যান্ডে শুরু হওয়া এই আলোচনা মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংকট নিরসনে একটি গুরুত্বপূর্ণ মোড় হতে পারে। যদিও এখনো অনেক বাধা রয়ে গেছে, তবুও উভয় পক্ষের আলোচনায় বসা এবং ৬০ দিনের রোডম্যাপে সম্মত হওয়া শান্তির সম্ভাবনাকে নতুন করে জোরালো করেছে।




























