চীনে অনুষ্ঠিত ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের ‘গ্রীষ্মকালীন দাভোস’ সম্মেলনের সাইডলাইনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেছেন কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ। বুধবার স্থানীয় সময় সকাল ১০টা ১৫ মিনিটে অনুষ্ঠিত এই বৈঠকে দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক, বাণিজ্য, বিনিয়োগ এবং ভবিষ্যৎ সহযোগিতা নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা হয়। সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন, এই বৈঠক বাংলাদেশ ও কাজাখস্তানের সম্পর্ককে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যেতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।
চীনের দালিয়ানে অনুষ্ঠিত বিশ্ব অর্থনৈতিক ফোরামের বার্ষিক সম্মেলনে অংশ নিতে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানরা একত্রিত হয়েছেন। এরই অংশ হিসেবে কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভের সঙ্গে বৈঠকে বসেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। বৈঠকটি ছিল সৌজন্যমূলক হলেও আলোচনায় উঠে আসে দুই দেশের কৌশলগত সম্পর্ক জোরদারের নানা বিষয়।
বৈঠকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বাংলাদেশ ও কাজাখস্তানের মধ্যে বিদ্যমান বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন। তিনি বলেন, দুই দেশের মধ্যে সহযোগিতার ক্ষেত্র আরও বিস্তৃত করার সুযোগ রয়েছে এবং তা কাজে লাগাতে উভয় পক্ষকে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
আলোচনার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ছিল দুই দেশে স্থায়ী কূটনৈতিক মিশন স্থাপন। বাংলাদেশ ও কাজাখস্তানের মধ্যে সম্পর্ক আরও কার্যকর ও গতিশীল করতে ঢাকা এবং আস্তানায় পূর্ণাঙ্গ কূটনৈতিক মিশন প্রতিষ্ঠার বিষয়ে দুই প্রধানমন্ত্রী নীতিগতভাবে একমত হন।
কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, স্থায়ী দূতাবাস প্রতিষ্ঠিত হলে দুই দেশের মধ্যে রাজনৈতিক যোগাযোগ বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য, বিনিয়োগ, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক সম্পর্কও আরও শক্তিশালী হবে।
বৈঠকে রাজনৈতিক পর্যায়ের পাশাপাশি ব্যবসায়িক এবং জনগণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধির প্রয়োজনীয়তার কথাও তুলে ধরা হয়। দুই দেশের প্রতিনিধিরা মনে করেন, নিয়মিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠক এবং পারস্পরিক সফর সম্পর্ক উন্নয়নের ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী ওলজাস বেকতেনভ দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বৃদ্ধির ব্যাপারে আশাবাদ ব্যক্ত করেন। তিনি বলেন, মধ্য এশিয়া ও দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে অর্থনৈতিক সহযোগিতার নতুন সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে এবং বাংলাদেশ সেই সম্ভাবনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশীদার হতে পারে।
বাংলাদেশের তৈরি পোশাক, ওষুধ, কৃষিপণ্য এবং হালকা প্রকৌশল খাতের পণ্যের জন্য কাজাখস্তানের বাজারে নতুন সম্ভাবনা রয়েছে বলে বৈঠকে আলোচনা হয়। একই সঙ্গে কাজাখস্তানের জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ খাতে সহযোগিতার বিষয়টিও গুরুত্ব পায়।
দুই নেতার আলোচনায় দক্ষ জনশক্তি রপ্তানির বিষয়টিও উঠে আসে। বাংলাদেশ থেকে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ শ্রমিক কাজাখস্তানে পাঠানোর সম্ভাবনা নিয়ে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছে বলে জানা গেছে। এতে উভয় দেশই লাভবান হতে পারে বলে মত দেন তারা।
নবায়নযোগ্য জ্বালানি খাতেও যৌথ উদ্যোগের সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। সৌরশক্তি, বায়ুশক্তি এবং সবুজ জ্বালানি প্রযুক্তিতে সহযোগিতা বৃদ্ধির বিষয়ে উভয় পক্ষ আগ্রহ প্রকাশ করে।
ডিজিটাল অবকাঠামো এবং প্রযুক্তি খাতেও নতুন সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে বলে বৈঠকে উল্লেখ করা হয়। বিশেষ করে তথ্যপ্রযুক্তি, স্মার্ট সেবা এবং ডিজিটাল রূপান্তরের ক্ষেত্রে দুই দেশ একে অপরের অভিজ্ঞতা কাজে লাগাতে পারে।
কৃষি ব্যবসা এবং খাদ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ খাতেও পারস্পরিক বিনিয়োগের সুযোগ নিয়ে আলোচনা হয়েছে। বাংলাদেশের কৃষি খাতের অভিজ্ঞতা এবং কাজাখস্তানের বৃহৎ কৃষিজমির সম্ভাবনাকে কাজে লাগিয়ে যৌথ উদ্যোগ নেওয়ার বিষয়ে মতবিনিময় হয়।
বৈঠকে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার বিষয়ও গুরুত্ব পায়। কাজাখস্তানের প্রধানমন্ত্রী জাতিসংঘের অধীনে পানি কূটনীতি বিষয়ক একটি বিশেষায়িত সংস্থা প্রতিষ্ঠার প্রস্তাবের কথা তুলে ধরেন এবং এ উদ্যোগে বাংলাদেশের সমর্থন কামনা করেন।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান এ বিষয়ে ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বাংলাদেশের সমর্থনের কথা জানান। তিনি বলেন, পানি ব্যবস্থাপনা এবং জলবায়ু পরিবর্তনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
বিশ্লেষকদের মতে, পানি কূটনীতি নিয়ে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে কাজাখস্তানের এই উদ্যোগ ভবিষ্যতে বৈশ্বিক পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। বাংলাদেশের মতো নদীমাতৃক দেশের জন্যও বিষয়টি বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
বৈঠকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান, প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবির এবং অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন উপস্থিত ছিলেন। তারা বিভিন্ন সহযোগিতা ক্ষেত্র নিয়ে আলোচনায় অংশ নেন।
চলমান বৈশ্বিক অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মধ্যে এই বৈঠককে অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ হিসেবে দেখছেন কূটনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। তাদের মতে, মধ্য এশিয়ার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দেশ কাজাখস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার হলে বাংলাদেশের জন্য নতুন অর্থনৈতিক ও কৌশলগত সুযোগ সৃষ্টি হবে।
ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সম্মেলনের ফাঁকে অনুষ্ঠিত এই বৈঠক শুধু সৌজন্য সাক্ষাৎ নয়, বরং ভবিষ্যৎ সহযোগিতার একটি শক্ত ভিত্তি তৈরির উদ্যোগ হিসেবেও বিবেচিত হচ্ছে। দুই দেশের মধ্যে পারস্পরিক আস্থা ও সহযোগিতা বৃদ্ধির মাধ্যমে নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হতে পারে।
বাংলাদেশ ও কাজাখস্তানের মধ্যে বাণিজ্য, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি, কৃষি এবং জনশক্তি খাতে সহযোগিতা বৃদ্ধির যে বার্তা এই বৈঠক থেকে এসেছে, তা আগামী দিনে দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ককে আরও শক্তিশালী করবে বলেই আশা করা হচ্ছে।


























