ফিফা বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্বের একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনা করে তীব্র সমালোচনার মুখে পড়েছেন ফিফা সভাপতি জিয়ান্নি ইনফান্তিনো। ইউয়েফা, কনকাকাফ এবং এএফসির বিরোধিতার মুখে শেষ পর্যন্ত সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে বিশ্ব ফুটবলের সর্বোচ্চ নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এর পর থেকেই ফুটবল অঙ্গনে আলোচনা শুরু হয়েছে, ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব কি শেষের পথে?
মঙ্গলবার ফিফা ‘ফিফা ফরওয়ার্ড এন্টারপ্রাইজ’ (এফএফই) নামে ২০ বিলিয়ন ডলারের একটি নতুন বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান গঠনের পরিকল্পনা ঘোষণা করে। এই প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভবিষ্যতে বিশ্বকাপসহ ফিফার বিভিন্ন প্রতিযোগিতার বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার কথা ছিল। পাশাপাশি বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক মালিকানার একটি অংশ বেসরকারি বিনিয়োগকারীদের কাছে বিক্রির পরিকল্পনাও করা হয়।
প্রস্তাবটি প্রকাশ্যে আসার পরপরই শুরু হয় ব্যাপক বিতর্ক। প্রথমে আপত্তি জানায় ইউরোপীয় ফুটবলের নিয়ন্ত্রক সংস্থা ইউয়েফা। এরপর উত্তর ও মধ্য আমেরিকার ফুটবল সংস্থা কনকাকাফ জানায়, তাদের ৪১টি সদস্য ফেডারেশনও এই পরিকল্পনার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে। পরে এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশন (এএফসি) ইউয়েফা ও কনকাকাফের সঙ্গে একাত্মতা প্রকাশ করে বিবৃতি দেয়।
বিরোধিতা আরও তীব্র আকার ধারণ করে যখন ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ উপদেষ্টা কার্লোস কর্দেইরো পদত্যাগ করেন। ক্রমবর্ধমান চাপ ও সমালোচনার মুখে শেষ পর্যন্ত বিতর্কিত পরিকল্পনা প্রত্যাহার করে ফিফা। এতে ইনফান্তিনোর নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের সক্ষমতা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে ফুটবল বিশ্বে।
২০১৬ সালে দুর্নীতির অভিযোগে বিদায় নেওয়া সেপ ব্লাটারের উত্তরসূরি হিসেবে ফিফার দায়িত্ব নেন ইনফান্তিনো। সেবার নির্বাচনে তিনি এশিয়ান ফুটবল কনফেডারেশনের সভাপতি শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফাকে পরাজিত করেছিলেন। ফুটবলে স্বচ্ছতা ও সংস্কারের প্রতিশ্রুতি দিয়ে ক্ষমতায় আসা ইনফান্তিনো পরবর্তীতে আরও দুই মেয়াদে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
তবে সময়ের সঙ্গে তার বেশ কিছু সিদ্ধান্ত বিতর্কের জন্ম দিয়েছে। সর্বশেষ বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব নিয়ে প্রস্তাবটি ফিফার অনেক গুরুত্বপূর্ণ অংশীদারের মধ্যে অসন্তোষ সৃষ্টি করেছে। ইউয়েফা প্রকাশ্যেই ফিফার নেতৃত্ব নিয়ে উদ্বেগ জানিয়েছে। কনকাকাফ ও এএফসিও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ার সমালোচনা করেছে।
আগামী বছরের ১৮ মার্চ অনুষ্ঠিত হবে ফিফা সভাপতি নির্বাচন। প্রার্থীদের মনোনয়ন জমা দেওয়ার শেষ সময় আগামী ১৮ নভেম্বর। মরক্কোতে অনুষ্ঠিতব্য ফিফার ৭৭তম কংগ্রেসকে সামনে রেখে ইতোমধ্যে সম্ভাব্য প্রার্থীদের নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে ফুটবল প্রশাসনের বিভিন্ন মহলে।
ইনফান্তিনোর সম্ভাব্য উত্তরসূরিদের তালিকায় অন্যতম নাম ভিক্টর মন্টগলিয়ানি। কনকাকাফ সভাপতি হিসেবে তিনি আন্তর্জাতিক ফুটবলে সুপরিচিত মুখ। ২০২৬ বিশ্বকাপ আয়োজনের প্রস্তুতি ও পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছেন তিনি। প্রশাসনিক দক্ষতা এবং বিভিন্ন অঞ্চলে গ্রহণযোগ্যতার কারণে তাকে শক্তিশালী প্রার্থী হিসেবে দেখা হচ্ছে।
আরেক আলোচিত নাম শেখ সালমান বিন ইব্রাহিম আল খলিফা। ২০১৩ সাল থেকে এএফসির নেতৃত্বে থাকা এই বাহরাইনি কর্মকর্তা এশিয়ান ফুটবলে দীর্ঘদিন ধরে প্রভাব বিস্তার করে আসছেন। ইনফান্তিনোর সাম্প্রতিক পরিকল্পনার অন্যতম সমালোচক হওয়ায় অনেকের মতে, তিনি এবার ফিফার শীর্ষ পদে লড়াইয়ে নামতে পারেন।
তালিকায় রয়েছে পিএসজি সভাপতি ও ইউরোপিয়ান ক্লাব ফুটবলের অন্যতম প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব নাসের আল-খেলাইফির নামও। যদিও আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের বিভিন্ন প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, তিনি ফিফা সভাপতির পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করতে আগ্রহী নন। তবুও তার প্রভাব ও অবস্থানের কারণে আলোচনায় রয়েছে তার নাম।
বর্তমান ফিফা মহাসচিব মাতিয়াস গ্রাফস্ট্রমও সম্ভাব্য প্রার্থীদের একজন। ইনফান্তিনোর ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে দীর্ঘদিন কাজ করেছেন তিনি। তবে বর্তমান প্রশাসনের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্কই নির্বাচনী লড়াইয়ে তার জন্য বড় বাধা হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক স্বত্ব বিতর্ক আপাতত থেমে গেলেও এর রাজনৈতিক প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। আগামী নির্বাচনে ইনফান্তিনো আবারও প্রার্থী হবেন কি না, কিংবা ফুটবল বিশ্বের ক্ষমতার ভারসাম্য কোন দিকে ঝুঁকবে, সেটাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন। ফুটবল প্রশাসনের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে আগামী কয়েক মাস তাই অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে যাচ্ছে।























