যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডা বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য অংশীদার। প্রতিদিন দুই দেশের মধ্যে শত শত কোটি ডলারের পণ্য ও সেবা আদান-প্রদান হয়। জ্বালানি, মোটরগাড়ি, কৃষিপণ্য, কাঠ, অ্যালুমিনিয়াম, ইস্পাত এবং বিভিন্ন শিল্পপণ্য এই বাণিজ্যের প্রধান খাত। তাই দুই দেশের মধ্যে শুল্ক বাড়ানো হলে উভয় দেশের ব্যবসা ও ভোক্তাদের ওপর প্রভাব পড়তে পারে।
অর্থনীতিবিদদের মতে, আমদানি পণ্যের ওপর অতিরিক্ত শুল্ক আরোপ করলে সেই পণ্যের দাম বেড়ে যায়। এর ফলে আমদানিকারক প্রতিষ্ঠান ও শেষ পর্যন্ত সাধারণ ভোক্তাদের বেশি মূল্য দিতে হয়। একই সঙ্গে সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হলে উৎপাদন ব্যয়ও বৃদ্ধি পেতে পারে।
অতীতের অভিজ্ঞতা বলছে, যুক্তরাষ্ট্র শুল্ক বাড়ালে কানাডাও অনেক সময় পাল্টা শুল্ক আরোপ করে। এর ফলে দুই দেশের মধ্যে বাণিজ্যিক উত্তেজনা আরও বৃদ্ধি পায়। কানাডা সরকার সাধারণত বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থার (WTO) নিয়ম এবং বিদ্যমান বাণিজ্য চুক্তির আওতায় নিজেদের অবস্থান তুলে ধরে।
যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর মধ্যে কার্যকর ইউএসএমসিএ (USMCA) মুক্ত বাণিজ্য চুক্তি উত্তর আমেরিকার অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই চুক্তির আওতায় অধিকাংশ পণ্য শুল্কমুক্ত বা স্বল্প শুল্কে বাণিজ্য করা হয়। নতুন শুল্ক আরোপের সিদ্ধান্ত এ চুক্তির বাস্তবায়ন ও ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, নতুন শুল্ক কার্যকর হলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে—
- অটোমোবাইল ও যন্ত্রাংশ শিল্প
- অ্যালুমিনিয়াম ও ইস্পাত
- কাঠ ও নির্মাণসামগ্রী
- কৃষি ও খাদ্যপণ্য
- জ্বালানি খাত
- উৎপাদনশিল্পের কাঁচামাল
এসব খাতের সঙ্গে যুক্ত হাজার হাজার প্রতিষ্ঠান ও লাখো কর্মসংস্থান সরাসরি বা পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হতে পারে।
ডোনাল্ড ট্রাম্প দীর্ঘদিন ধরেই “America First” নীতির পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন। তার দাবি, বিদেশি পণ্যের ওপর বেশি শুল্ক আরোপ করলে দেশীয় শিল্প সুরক্ষা পাবে, উৎপাদন বাড়বে এবং যুক্তরাষ্ট্রে নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি হবে। তবে সমালোচকদের মতে, অতিরিক্ত শুল্ক দীর্ঘমেয়াদে ভোক্তাদের ব্যয় বাড়ায় এবং আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে অস্থিরতা সৃষ্টি করে।
বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক অংশীদারের মধ্যে বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়লে আন্তর্জাতিক বাজারেও এর প্রভাব পড়তে পারে। শেয়ারবাজার, পণ্যের মূল্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ এবং বৈশ্বিক সরবরাহ ব্যবস্থায় অনিশ্চয়তা তৈরি হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। বিশেষ করে উত্তর আমেরিকার সরবরাহ শৃঙ্খলের ওপর নির্ভরশীল আন্তর্জাতিক কোম্পানিগুলো নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়ন করতে পারে।
অর্থনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, বাণিজ্যিক বিরোধ কেবল অর্থনীতিতেই সীমাবদ্ধ থাকে না; এটি কূটনৈতিক সম্পর্কেও প্রভাব ফেলে। সীমান্ত নিরাপত্তা, জ্বালানি সহযোগিতা, পরিবেশ এবং অভিবাসনসহ বিভিন্ন ইস্যুতে যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডার ঘনিষ্ঠ সহযোগিতা রয়েছে। বাণিজ্য উত্তেজনা বাড়লে এসব ক্ষেত্রেও আলোচনা জটিল হয়ে উঠতে পারে।
বিশ্লেষকদের ধারণা, শুল্ক কার্যকরের নির্ধারিত সময়ের আগেই দুই দেশের মধ্যে আলোচনা হতে পারে। যদি সমঝোতা না হয়, তাহলে পাল্টাপাল্টি শুল্ক আরোপের মাধ্যমে একটি নতুন বাণিজ্য বিরোধের সূচনা হতে পারে। তবে শেষ পর্যন্ত কী হবে, তা নির্ভর করবে দুই দেশের সরকারের আলোচনার অগ্রগতি এবং নীতিগত সিদ্ধান্তের ওপর।




























