দুর্নীতি প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে সরকার আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে বলে জানিয়েছেন তথ্য ও সম্প্রচার প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেছেন, দেশের উন্নয়ন ও সুশাসন নিশ্চিত করতে দুর্নীতির বিরুদ্ধে কোনো ধরনের আপস করা হবে না। সরকারি প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন সেবা খাত পর্যন্ত সর্বত্র স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতি একটি রাষ্ট্রের উন্নয়নকে বাধাগ্রস্ত করে এবং জনগণের অধিকার ক্ষুণ্ন করে। তাই সরকার দুর্নীতির বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে এবং এ নীতি বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী ঘোষিত দুর্নীতিবিরোধী অবস্থান শুধু একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার নয়, বরং এটি প্রশাসনিক বাস্তবতায় রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ চলছে। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্বশীলতা বাড়ানোর পাশাপাশি প্রযুক্তিনির্ভর সেবা সম্প্রসারণের মাধ্যমে দুর্নীতির সুযোগ কমিয়ে আনা হচ্ছে।
তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর থেকেই দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে বিভিন্ন সংস্কারমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। সরকারি ক্রয়, নিয়োগ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, কর প্রশাসন এবং নাগরিক সেবা প্রদানের ক্ষেত্রে ডিজিটাল পদ্ধতি চালুর ফলে অনেক ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা বৃদ্ধি পেয়েছে।
তিনি উল্লেখ করেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য আইন প্রয়োগকারী সংস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং অন্যান্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের সক্ষমতা বৃদ্ধি করা হয়েছে। দুর্নীতির অভিযোগ প্রমাণিত হলে রাজনৈতিক পরিচয় বা সামাজিক অবস্থান বিবেচনা না করে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।
তার ভাষায়, “দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। সরকার সবার জন্য সমান আইন প্রয়োগে বিশ্বাস করে।”
প্রতিমন্ত্রী বলেন, ডিজিটাল বাংলাদেশ গঠনের ধারাবাহিকতায় সরকারি বিভিন্ন সেবা অনলাইনে নিয়ে আসা হয়েছে। এর ফলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি কমেছে এবং দালালচক্র ও অনিয়মের সুযোগ হ্রাস পেয়েছে।
তিনি জানান, অনলাইন আবেদন, ই-নথি, ই-জিপি, ডিজিটাল পেমেন্ট এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর সেবা ব্যবস্থার মাধ্যমে সরকারি কার্যক্রমে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হয়েছে। এসব উদ্যোগের ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম আরও দ্রুত ও জবাবদিহিমূলক হয়েছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা দুর্নীতি কমানোর ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। কারণ এতে সরাসরি যোগাযোগ কমে যায় এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের প্রক্রিয়া সহজে পর্যবেক্ষণ করা যায়।
তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, শুধু সরকারের উদ্যোগে দুর্নীতি নির্মূল করা সম্ভব নয়। এ ক্ষেত্রে জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণও প্রয়োজন। সমাজের প্রতিটি স্তরে সততা, নৈতিকতা এবং দায়িত্ববোধ গড়ে তুলতে হবে।
তিনি বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলা জরুরি। কোনো অনিয়ম বা দুর্নীতির ঘটনা নজরে এলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করতে হবে। গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।
তার মতে, সচেতন জনগণই দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনের সবচেয়ে বড় শক্তি। তাই তরুণ প্রজন্মকে নৈতিক মূল্যবোধে উদ্বুদ্ধ করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, গণমাধ্যম সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করে। দুর্নীতি, অনিয়ম এবং অপশাসনের বিষয়গুলো জনগণের সামনে তুলে ধরার ক্ষেত্রে সংবাদমাধ্যম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে থাকে।
তিনি বলেন, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা দুর্নীতির বিরুদ্ধে জনমত গঠনে সহায়ক। তবে তথ্য যাচাই ছাড়া বিভ্রান্তিকর সংবাদ প্রকাশ করা উচিত নয়। সঠিক তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা সমাজে ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে।
তিনি আরও বলেন, সরকার সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতাকে সম্মান করে এবং গঠনমূলক সমালোচনাকে স্বাগত জানায়। কারণ জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে গণমাধ্যমের ভূমিকা অপরিহার্য।
তথ্য প্রতিমন্ত্রী বলেন, সরকারি কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা মূল্যায়ন এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে বিভিন্ন পর্যায়ে নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সরকারি প্রকল্প বাস্তবায়নের ক্ষেত্রেও নিয়মিত তদারকি করা হচ্ছে।
তিনি জানান, উন্নয়ন প্রকল্পে অনিয়ম বা অর্থ অপচয়ের অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত তদন্ত করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ও আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।
তার মতে, উন্নয়ন প্রকল্পের অর্থ জনগণের সম্পদ। তাই এই অর্থের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব।
অনুষ্ঠানে উপস্থিত তরুণদের উদ্দেশে প্রতিমন্ত্রী বলেন, একটি দুর্নীতিমুক্ত বাংলাদেশ গঠনে তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসতে হবে। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন এবং সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে সততা ও নৈতিকতার চর্চা বাড়াতে হবে।
তিনি বলেন, তরুণরা যদি দুর্নীতিকে সামাজিকভাবে ঘৃণ্য অপরাধ হিসেবে প্রতিষ্ঠা করতে পারে, তাহলে ভবিষ্যতে দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠন অনেক সহজ হবে।
তথ্যপ্রযুক্তি ব্যবহারে দক্ষ নতুন প্রজন্ম প্রশাসনিক স্বচ্ছতা বৃদ্ধিতে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।
বিশ্লেষকরা মনে করেন, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ করা গেলে বিনিয়োগ বৃদ্ধি পায়, কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয় এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত হয়। তথ্য প্রতিমন্ত্রীও তার বক্তব্যে এ বিষয়টি তুলে ধরে বলেন, দুর্নীতিমুক্ত পরিবেশ ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অনুকূল পরিস্থিতি সৃষ্টি করে।
তিনি বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক পরিবেশকে গুরুত্ব দেয়। তাই দুর্নীতির বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থান দেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে।
প্রতিমন্ত্রী বলেন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক মূল্যবোধ জোরদার করাও জরুরি। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান এবং ধর্মীয় সংগঠনগুলোকে নৈতিকতা শিক্ষায় আরও বেশি গুরুত্ব দিতে হবে।
তিনি বলেন, ছোটবেলা থেকেই সততা, ন্যায়পরায়ণতা এবং দায়িত্ববোধের শিক্ষা দিতে পারলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম দুর্নীতিমুক্ত সমাজ গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারবে।
দুর্নীতি প্রতিরোধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি বাস্তবায়নে সরকার কঠোর অবস্থানে রয়েছে বলে তথ্য প্রতিমন্ত্রীর বক্তব্যে স্পষ্ট হয়েছে। তিনি মনে করেন, প্রযুক্তিনির্ভর সেবা, প্রশাসনিক জবাবদিহিতা, গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকা এবং জনগণের সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে দুর্নীতি অনেকাংশে নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব।
সুশাসন প্রতিষ্ঠা, উন্নয়ন কার্যক্রমের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ এবং নাগরিক সেবার মানোন্নয়নের জন্য দুর্নীতির বিরুদ্ধে অব্যাহত অভিযান চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছেন তিনি। সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, সরকারের এ উদ্যোগ কার্যকরভাবে বাস্তবায়িত হলে একটি স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং উন্নত বাংলাদেশ গঠনের পথ আরও সুগম হবে।




























