যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান সংঘাতকে কেন্দ্র করে মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা আরও বেড়েছে। পেন্টাগনের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, গত দুই সপ্তাহে বিভিন্ন হামলায় প্রায় ১০০ মার্কিন সেনা আহত হয়েছেন। যদিও যুক্তরাষ্ট্র বলছে, অধিকাংশ সেনাই সামান্য আহত হয়েছেন এবং দ্রুত দায়িত্বে ফিরেছেন, তবুও এ ঘটনাগুলো ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের গভীরতা এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে।
পেন্টাগনের প্রধান মুখপাত্র শন পার্নেল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স (X)-এ প্রকাশিত এক বিবৃতিতে জানান, আহত মার্কিন সেনাদের মধ্যে প্রায় ৯৬ শতাংশ ইতোমধ্যেই চিকিৎসা শেষে পুনরায় দায়িত্বে ফিরেছেন। তিনি বলেন, আহতদের বেশিরভাগই বিস্ফোরণের অভিঘাত, ধ্বংসাবশেষ বা ক্ষুদ্র শারীরিক আঘাতের শিকার হয়েছেন। তিনি আরও দাবি করেন, মার্কিন সেনা হতাহতের তথ্য গোপন করা হয়েছে—এমন অভিযোগ সঠিক নয়।
এই বক্তব্য আসে নিউইয়র্ক টাইমস-এর এক প্রতিবেদনের পর, যেখানে অভিযোগ করা হয়েছিল যে সংঘাতে আহত সেনাদের প্রকৃত সংখ্যা শুরুতে প্রকাশ করা হয়নি।
মার্কিন কর্মকর্তাদের মতে, আহত সেনাদের বেশিরভাগই মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন মার্কিন ঘাঁটিতে অবস্থান করছিলেন। এর মধ্যে রয়েছে—
- জর্ডানে অবস্থিত সামরিক ঘাঁটি
- কুয়েতের মার্কিন স্থাপনা
- বাহরাইনে নৌঘাঁটি
- ইরাক ও সিরিয়ায় মার্কিন ঘাঁটির আশপাশ
এসব স্থাপনায় ড্রোন, ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র এবং রকেট হামলার ঘটনা ঘটেছে বলে জানা গেছে।
মার্কিন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, অধিকাংশ সেনা সরাসরি গুলিবিদ্ধ হননি। বরং তারা আহত হয়েছেন—
- ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র বিস্ফোরণের শকওয়েভে (Blast Injury)
- ড্রোন হামলার ধ্বংসাবশেষে
- সামরিক স্থাপনা ধসে পড়ার কারণে
- ক্ষেপণাস্ত্র প্রতিরক্ষা ব্যবস্থার বিস্ফোরণের অভিঘাতে
বিশেষজ্ঞদের মতে, এসব ধরনের আঘাত বাইরে থেকে তেমন গুরুতর না দেখালেও অনেক ক্ষেত্রে মস্তিষ্কে আঘাত (Traumatic Brain Injury-TBI), শ্রবণশক্তির ক্ষতি এবং দীর্ঘমেয়াদি স্নায়বিক সমস্যার কারণ হতে পারে।
পেন্টাগন নিশ্চিত করেছে যে, জর্ডানে ইরানি হামলায় আরও দুই মার্কিন সেনা নিহত হয়েছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ১৯ জুলাই জয়েন্ট বেস অ্যান্ড্রুজে সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে নিহত সেনাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানান এবং তাদের পরিবারকে সমবেদনা জানান।
এর আগে একই অঞ্চলে হামলায় একাধিক মার্কিন সেনা নিহত হওয়ার ঘটনাও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছিল।
জর্ডানে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলো সিরিয়া ও ইরাক সীমান্তের খুব কাছাকাছি হওয়ায় এগুলো কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, জর্ডানের ঘাঁটিতে হামলার মাধ্যমে ইরান একটি বার্তা দিতে চেয়েছে যে, শুধুমাত্র উপসাগরীয় অঞ্চল নয়, যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক নেটওয়ার্কের যেকোনো অংশই তাদের হামলার আওতায় আসতে পারে।
ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী (IRGC) জানিয়েছে, তারা যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক উপস্থিতিকে লক্ষ্য করে নতুন করে হামলা চালিয়েছে।
আইআরজিসির দাবি অনুযায়ী, হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল—
- বাহরাইনে মার্কিন সামরিক স্থাপনা
- কুয়েতে বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা
- একটি গুরুত্বপূর্ণ রাডার কেন্দ্র
- আঞ্চলিক সামরিক অবকাঠামো
তবে এসব হামলায় কতটা ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে, সে বিষয়ে স্বাধীনভাবে নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
ইরানের হামলার পরপরই কুয়েত, বাহরাইন ও জর্ডান নিজেদের আকাশ প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় নিয়ে যায়।
এসব দেশের সরকার জানিয়েছে—
- বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা সক্রিয় রাখা হয়েছে।
- গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ও জ্বালানি স্থাপনায় নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে আকাশসীমা পর্যবেক্ষণ বাড়ানো হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের এই তিন দেশ যুক্তরাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ সামরিক অংশীদার হওয়ায় ভবিষ্যতেও তারা হামলার ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
সংঘাতের মধ্যে বিশ্বের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি রুট হরমুজ প্রণালিতেও উত্তেজনা তৈরি হয়েছে।
সাম্প্রতিক ঘটনায়—
- একটি তেলবাহী ট্যাংকার অজ্ঞাত একটি ক্ষেপণাস্ত্রের আঘাতে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
- জাহাজে আগুন ধরে গেলে নাবিকরা জরুরি ভিত্তিতে লাইফবোটে আশ্রয় নেন।
- জাহাজটির নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে উদ্ধার অভিযান শুরু হয়।
এ ঘটনার পর আন্তর্জাতিক শিপিং কোম্পানিগুলো ওই এলাকায় চলাচল নিয়ে নতুন করে ঝুঁকি মূল্যায়ন শুরু করেছে।
ইরান-যুক্তরাষ্ট্র সংঘাতের কারণে ইতোমধ্যেই—
- আন্তর্জাতিক তেলের বাজারে অস্থিরতা দেখা দিয়েছে।
- হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে।
- মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থানরত বিদেশি নাগরিকদের নিরাপত্তা নিয়ে সতর্কতা জারি হয়েছে।
- যুক্তরাষ্ট্রের আঞ্চলিক সামরিক ঘাঁটিগুলোতে অতিরিক্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, যদি পাল্টাপাল্টি হামলা অব্যাহত থাকে, তাহলে সংঘাত আরও বিস্তৃত আকার নিতে পারে। বিশেষ করে মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক ঘাঁটি, জ্বালানি অবকাঠামো এবং আন্তর্জাতিক নৌপথ ভবিষ্যতেও হামলার ঝুঁকিতে থাকতে পারে।
তবে কূটনৈতিক পর্যায়ে উত্তেজনা কমানোর চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে। জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক পক্ষ উভয় দেশকে সংযম প্রদর্শনের আহ্বান জানিয়েছে।


























