স্মৃতিশক্তি কমে যাওয়া, মনোযোগ ধরে রাখতে সমস্যা কিংবা দ্রুত ক্লান্ত হয়ে পড়া—এসব সমস্যার পেছনে শুধু বয়স বা মানসিক চাপই দায়ী নয়, দৈনন্দিন খাদ্যাভ্যাসও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বিশ্ব মস্তিষ্ক দিবস উপলক্ষে ভারতের নিউরোসার্জন ডা. শ্রীকান্ত শর্মা জানিয়েছেন, মস্তিষ্ককে সুস্থ ও কর্মক্ষম রাখতে প্রতিদিনের খাবারে সঠিক পুষ্টি নিশ্চিত করা জরুরি। তার মতে, কিছু নির্দিষ্ট খাবার নিয়মিত খেলে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং চিন্তাশক্তি দীর্ঘদিন ভালো রাখা সম্ভব।
মস্তিষ্ক মানবদেহের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ। শরীরের মোট শক্তির প্রায় ২০ শতাংশ ব্যবহার করে এটি। তাই প্রয়োজনীয় পুষ্টির ঘাটতি হলে শুধু শরীর নয়, চিন্তাশক্তি, শেখার ক্ষমতা এবং সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতাও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। যদিও বয়স ও জিনগত কারণ পরিবর্তন করা সম্ভব নয়, তবে স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসের মাধ্যমে মস্তিষ্কের সুস্থতা অনেকটাই ধরে রাখা যায় বলে জানিয়েছেন এই বিশেষজ্ঞ।
কেন খাদ্যাভ্যাস গুরুত্বপূর্ণ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, মস্তিষ্কের কোষগুলোকে সক্রিয় রাখতে প্রয়োজন পর্যাপ্ত শক্তি, ভিটামিন, মিনারেল, স্বাস্থ্যকর চর্বি এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট। সঠিক খাবার শুধু স্মৃতিশক্তিই বাড়ায় না, বরং দীর্ঘমেয়াদে ডিমেনশিয়া ও অন্যান্য স্নায়বিক সমস্যার ঝুঁকিও কমাতে সাহায্য করতে পারে।
স্মৃতিশক্তি ও মনোযোগ বাড়াতে যেসব খাবার খাবেন
১. অন্ত্রের স্বাস্থ্য ভালো রাখে এমন খাবার
বিশেষজ্ঞের মতে, অন্ত্র ও মস্তিষ্কের মধ্যে একটি শক্তিশালী যোগাযোগ ব্যবস্থা রয়েছে, যাকে গাট-ব্রেন অ্যাক্সিস বলা হয়। অন্ত্রে থাকা উপকারী ব্যাকটেরিয়া মানসিক স্বাস্থ্য, শেখার ক্ষমতা এবং স্মৃতিশক্তির ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলে।
খাদ্যতালিকায় রাখুন—
- দই
- ঘোল
- ছোলা
- রাজমা
- বিভিন্ন ধরনের মিলেট
এসব খাবার অন্ত্রের উপকারী ব্যাকটেরিয়ার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করে। পাশাপাশি শরীরের প্রদাহ কমিয়ে মস্তিষ্ককে সুরক্ষিত রাখতেও ভূমিকা রাখে।
২. স্বাস্থ্যকর চর্বি
অনেকেই মনে করেন চর্বি মানেই ক্ষতিকর। কিন্তু সব ধরনের চর্বি শরীরের জন্য সমান নয়। বিশেষ করে ওমেগা-৩ ফ্যাটি অ্যাসিড মস্তিষ্কের কোষগুলোর মধ্যে যোগাযোগ উন্নত করতে এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রদাহ কমাতে সহায়তা করে।
ওমেগা-৩-এর ভালো উৎস—
- স্যালমন মাছ
- সারডিন মাছ
- আখরোট
- তিসির বীজ
নিয়মিত এসব খাবার খেলে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা ভালো রাখতে সহায়তা মিলতে পারে।
৩. অ্যান্টিঅক্সিডেন্টসমৃদ্ধ ফল ও শাকসবজি
মস্তিষ্কের কোষ প্রতিনিয়ত অক্সিডেটিভ স্ট্রেসের মুখোমুখি হয়। অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট এই ক্ষতি কমাতে সাহায্য করে এবং কোষকে সুস্থ রাখে।
খাদ্যতালিকায় রাখুন—
- বেরিজ
- পালং শাক
- টমেটো
- গাজর
- বিট
রঙিন ফল ও শাকসবজিতে থাকা ভিটামিন ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট জ্ঞানীয় কার্যক্ষমতা উন্নত করতে সহায়ক বলে জানিয়েছেন নিউরোসার্জন।
৪. প্রয়োজনীয় ভিটামিন
ডা. শ্রীকান্ত শর্মার মতে, ভিটামিন বি৬, বি১২ এবং ফোলেট মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্রম বজায় রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
এসব ভিটামিন পাওয়া যায়—
- সবুজ শাকসবজি
- ডাল
- ডিম
- দুধ
- দুগ্ধজাত খাবার
- ফোর্টিফায়েড খাদ্য
তিনি আরও জানান, নিরামিষভোজীদের ক্ষেত্রে ভিটামিন বি১২-এর ঘাটতি হওয়ার ঝুঁকি বেশি থাকে। কারণ এই ভিটামিনের প্রধান উৎস প্রাণিজ খাদ্য। দীর্ঘদিন বি১২-এর ঘাটতি থাকলে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ এবং স্নায়ুর কার্যকারিতা দুর্বল হতে পারে।
৫. সঠিক ধরনের কার্বোহাইড্রেট
মস্তিষ্কের প্রধান জ্বালানি হলো গ্লুকোজ। তবে অতিরিক্ত চিনি বা প্রক্রিয়াজাত কার্বোহাইড্রেট রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়িয়ে আবার কমিয়ে দেয়। এতে ক্লান্তি, অবসাদ এবং মনোযোগের ঘাটতি দেখা দিতে পারে।
এর পরিবর্তে বেছে নিন—
- ওটস
- মিলেট
- পূর্ণ শস্য
- বিভিন্ন ধরনের ডাল
এসব খাবার ধীরে ধীরে শক্তি সরবরাহ করে। ফলে দীর্ঘ সময় মনোযোগ ধরে রাখা সহজ হয় এবং মস্তিষ্কও সক্রিয় থাকে।
শুধু খাবার নয়, প্রয়োজন স্বাস্থ্যকর জীবনযাপন
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি বা দুটি খাবার খেলেই স্মৃতিশক্তি বাড়বে—এমন ধারণা ঠিক নয়। সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য প্রয়োজন সমন্বিত জীবনধারা।
মস্তিষ্ক ভালো রাখতে যা করবেন
- প্রতিদিন সুষম খাদ্য গ্রহণ করুন।
- অন্তত ৭ থেকে ৮ ঘণ্টা ঘুমান।
- নিয়মিত শরীরচর্চা করুন।
- মানসিক চাপ নিয়ন্ত্রণে রাখুন।
- পর্যাপ্ত পানি পান করুন।
- ধূমপান ও অতিরিক্ত প্রক্রিয়াজাত খাবার এড়িয়ে চলুন।
বিশেষজ্ঞের পরামর্শ
ডা. শ্রীকান্ত শর্মার মতে, বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা কিছুটা কমে যাওয়া স্বাভাবিক। তবে প্রতিদিনের খাদ্যাভ্যাসে ছোট ছোট ইতিবাচক পরিবর্তন দীর্ঘমেয়াদে বড় সুফল দিতে পারে। ওমেগা-৩ সমৃদ্ধ খাবার, অ্যান্টিঅক্সিডেন্টযুক্ত ফল-সবজি, ভিটামিন বি-সমৃদ্ধ খাদ্য এবং স্বাস্থ্যকর কার্বোহাইড্রেট নিয়মিত খেলে স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও চিন্তাশক্তি দীর্ঘদিন ভালো রাখা সম্ভব।
বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, সুস্থ মস্তিষ্কের জন্য কোনো একক “সুপারফুড” নেই। বরং সুষম খাদ্য, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, নিয়মিত ব্যায়াম এবং মানসিক সুস্থতা—এই চারটি বিষয় একসঙ্গে মেনে চললেই দীর্ঘমেয়াদে মস্তিষ্ক ভালো থাকে এবং দৈনন্দিন জীবনে মনোযোগ ও কর্মক্ষমতা বজায় রাখা সহজ হয়।























