অফিসে মিটিং, শ্রেণিকক্ষ, বাস কিংবা পরিবারের আড্ডা—হঠাৎ পাশের কেউ হাই তুলতেই কিছুক্ষণ পর নিজেরও হাই চলে আসে। এমন অভিজ্ঞতা প্রায় সবারই হয়েছে। অনেকেই মনে করেন, এটি শুধু ঘুম বা ক্লান্তির লক্ষণ। তবে গবেষকরা বলছেন, বিষয়টি এতটা সহজ নয়। অন্যকে হাই তুলতে দেখলে নিজেরও হাই আসার পেছনে রয়েছে মানুষের মস্তিষ্কের স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া, সামাজিক আচরণ এবং কিছু বিশেষ স্নায়ুকোষের কার্যক্রম। অর্থাৎ এটি কোনো রোগ বা ছোঁয়াচে সমস্যা নয়, বরং মানুষের স্বাভাবিক জৈবিক ও মানসিক প্রক্রিয়ার অংশ।
হাই তোলা কি শুধু ঘুমের লক্ষণ?
অনেকের ধারণা, হাই মানেই শরীর ক্লান্ত বা ঘুম পাচ্ছে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এটি পুরোপুরি সত্য নয়। ঘুমঘুম ভাবের সময় যেমন হাই উঠতে পারে, তেমনি দীর্ঘক্ষণ মনোযোগ দিয়ে কাজ করার পর কিংবা একঘেয়ে পরিবেশেও হাই আসতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, হাই তোলার মাধ্যমে শরীর আবার কিছুটা সক্রিয় হওয়ার সংকেত পায়। এতে মস্তিষ্ক সতেজ হতে সাহায্য করে এবং মনোযোগও কিছুটা ফিরে আসে।
মস্তিষ্ককে ঠান্ডা রাখতেও ভূমিকা রাখে হাই
আগে ধারণা করা হতো, শরীরে অক্সিজেন কমে গেলে বা কার্বন ডাই-অক্সাইড বেড়ে গেলে মানুষ হাই তোলে। তবে সাম্প্রতিক গবেষণায় এই ধারণার পক্ষে শক্ত প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, হাই তোলার সময়—
- বাইরের বাতাস শরীরে প্রবেশ করে।
- মুখ ও চোখের পেশির নড়াচড়ায় রক্তসঞ্চালন কিছুটা বৃদ্ধি পায়।
- মস্তিষ্কের তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে সহায়তা করে।
- মস্তিষ্ককে সতেজ ও সচল রাখতে ভূমিকা রাখে।
এ কারণে অনেক বিজ্ঞানী হাইকে মস্তিষ্কের একটি প্রাকৃতিক ‘কুলিং সিস্টেম’ হিসেবে বিবেচনা করেন।
অন্যকে হাই তুলতে দেখলে নিজেরও হাই আসে কেন?
সবচেয়ে কৌতূহলের বিষয় হলো, একজনকে হাই তুলতে দেখলে আশপাশের অন্যদেরও হাই আসতে শুরু করে। গবেষকদের মতে, এর মূল কারণ মানুষের স্বাভাবিক অনুকরণ করার প্রবণতা।
মানুষ অজান্তেই আশপাশের মানুষের বিভিন্ন আচরণ অনুসরণ করে। যেমন—
- হাসি দেখে হাসা।
- কারও মুখভঙ্গি নকল করা।
- হাই তুলতে দেখে নিজেও হাই তোলা।
এ ধরনের আচরণকে সামাজিক প্রতিক্রিয়ার একটি স্বাভাবিক অংশ হিসেবে দেখা হয়।
মিরর নিউরনের ভূমিকা
গবেষকদের মতে, মানুষের মস্তিষ্কে মিরর নিউরন নামে পরিচিত কিছু বিশেষ স্নায়ুকোষ রয়েছে। এগুলো অন্যের আচরণ পর্যবেক্ষণ করে তা বোঝা এবং অনেক সময় অজান্তেই অনুকরণ করতে সাহায্য করে।
এ ছাড়া অন্যের অনুভূতি বোঝা, সহমর্মিতা প্রকাশ করা এবং সামাজিক সংযোগ তৈরি করার ক্ষেত্রেও এই স্নায়ুকোষগুলোর ভূমিকা রয়েছে। তাই কারও হাই দেখা মাত্র মস্তিষ্ক একই ধরনের প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।
শুধু মানুষ নয়, প্রাণীদের মধ্যেও দেখা যায়
শুধু মানুষের মধ্যেই নয়, কিছু প্রাণীর মধ্যেও সংক্রামক হাইয়ের মতো আচরণ দেখা গেছে।
গবেষণায় পাওয়া তথ্য অনুযায়ী—
- অনেক সময় মালিককে হাই তুলতে দেখে পোষা কুকুরও হাই তোলে।
- কিছু ক্ষেত্রে বিড়ালের মধ্যেও একই ধরনের আচরণ দেখা গেছে।
- তবে প্রাণীদের ক্ষেত্রে এ বিষয়ে আরও বিস্তৃত গবেষণা প্রয়োজন বলে মনে করছেন বিজ্ঞানীরা।
অটিজমে আক্রান্ত শিশুদের ক্ষেত্রে কী দেখা যায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, অটিজমে আক্রান্ত অনেক শিশুর ক্ষেত্রে অন্যকে হাই তুলতে দেখেও একই প্রতিক্রিয়া নাও দেখা যেতে পারে।
এর সম্ভাব্য কারণ হলো—
- সামাজিক সংকেত বোঝার ধরনে পার্থক্য।
- অন্যের অনুভূতির সঙ্গে মানসিক সংযোগ তৈরির ভিন্নতা।
- মস্তিষ্কের প্রতিক্রিয়ার আলাদা বৈশিষ্ট্য।
তবে এটি সব অটিজম আক্রান্ত শিশুর ক্ষেত্রে এক রকম নয় বলে গবেষকরা উল্লেখ করেছেন।
হাই নিয়ে যেসব তথ্য জানা জরুরি
হাই সম্পর্কে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ তথ্য—
- হাই তোলা কোনো রোগ নয়।
- এটি ভাইরাস বা জীবাণুর মতো ছোঁয়াচে নয়।
- শুধু ঘুমের কারণেই হাই ওঠে না।
- মস্তিষ্ককে সতেজ রাখতে এটি ভূমিকা রাখতে পারে।
- অন্যকে দেখে হাই ওঠা মানুষের স্বাভাবিক সামাজিক ও স্নায়ুবৈজ্ঞানিক প্রতিক্রিয়া।
সব মিলিয়ে, হাই তোলা মানুষের শরীর ও মস্তিষ্কের একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। অন্যকে হাই তুলতে দেখলে নিজেরও হাই চলে আসা কোনো অস্বাভাবিক বিষয় নয়। বরং এটি মানুষের মস্তিষ্কের অনুকরণ ক্ষমতা, সামাজিক সংযোগ এবং স্নায়ুতন্ত্রের কার্যক্রমের একটি আকর্ষণীয় উদাহরণ। তাই পরেরবার পাশে কেউ হাই তুললে নিজেরও হাই এলে অবাক হওয়ার কিছু নেই—এটি আপনার মস্তিষ্কেরই স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
























