রোহিত যাদব—এই নামটি হয়তো ভারতের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে খুব পরিচিত নয়। কিন্তু বয়স নিয়ে তৈরি হওয়া এক অদ্ভুত বিতর্কে এখন আলোচনার কেন্দ্রে ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ দলের এই লেগ স্পিনার। কারণ, একজন ক্রিকেটারের জন্মসাল যেখানে একটি হওয়ার কথা, সেখানে রোহিতের নামে পাওয়া গেছে একাধিক জন্মসনের তথ্য। বিষয়টি শেষ পর্যন্ত গড়িয়েছে নিষেধাজ্ঞা পর্যন্ত। বয়সসংক্রান্ত তথ্যের অসঙ্গতির কারণে তাঁকে দুই বছরের জন্য সব ধরনের ক্রিকেট থেকে নিষিদ্ধ করেছে ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ড (বিসিসিআই)। অর্থাৎ মাঠে তাঁর সাম্প্রতিক পারফরম্যান্সের চেয়ে এখন তাঁর পরিচয়ের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে নথিপত্রের এই বড় প্রশ্ন।
ঘটনার সূত্রপাত ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন অব বেঙ্গলের (সিএবি) নিয়মিত নথি যাচাইয়ের সময়। নতুন মৌসুম শুরুর আগে খেলোয়াড়দের বিভিন্ন কাগজপত্র পরীক্ষা করতে গিয়ে রোহিতকে ঘিরে একাধিক অসঙ্গতি চোখে পড়ে। তদন্তে তাঁর নামে ২০০৮, ২০০৯ এবং ২০১০—এই তিনটি ভিন্ন জন্মসনদের তথ্য পাওয়ার কথা জানিয়েছে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম। একজন খেলোয়াড়ের বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে অংশ নেওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণে জন্মতারিখ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। তাই একই ব্যক্তির নামে একাধিক জন্মসনদ পাওয়ার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই গুরুতর হয়ে ওঠে। এরপরই তাঁকে ঘিরে শুরু হয় বিস্তারিত যাচাই-বাছাই।
শুধু জন্মসনদেই নয়, রোহিতের আধার কার্ডের তথ্যেও দেখা গেছে বড় ধরনের পার্থক্য। সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সিএবির নিবন্ধনে তাঁর জন্মসাল ২০০৭ হিসেবে উল্লেখ ছিল। আবার ২০১৭ ও ২০২০ সালে হালনাগাদ করা আধার নথিতে জন্মসাল ছিল ২০০৬। পরে ২০২১ সালে সেই তথ্য পরিবর্তন করে ২০০৯ করা হয়। ফলে একই ক্রিকেটারের বয়সসংক্রান্ত নথিতে একাধিক ভিন্ন তথ্য পাওয়ায় সন্দেহ আরও জোরালো হয়। বিষয়টি খতিয়ে দেখার পর আসন্ন অস্ট্রেলিয়া সফরের জন্য ঘোষিত ভারত অনূর্ধ্ব-১৯ দল থেকেও তাঁকে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
রোহিতের ঘটনা অবশ্য একেবারে বিচ্ছিন্ন নয়। বয়সসংক্রান্ত নথিতে অসঙ্গতির অভিযোগে সিএবি আরও ৬৪ জন ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়েছে। তাঁদের মধ্যে সবচেয়ে পরিচিত নামগুলোর একটি রবি কুমার। ২০২২ সালের অনূর্ধ্ব-১৯ বিশ্বকাপজয়ী ভারতীয় দলের এই বাঁহাতি পেসারের ক্ষেত্রেও বয়স নিয়ে বড় ধরনের গরমিল পাওয়া গেছে। ক্রিকেটভিত্তিক সংবাদমাধ্যম ক্রিকইনফোর তথ্য অনুযায়ী, রবি কুমারের বয়সের নথিতে পার্থক্য ছিল ৪০ মাসেরও বেশি। এর ফলে ২০২৫-২৬ মৌসুম পর্যন্ত বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে তাঁর আগের রেকর্ডগুলো বাতিল হিসেবে গণ্য হবে।
বয়স জালিয়াতির বিষয়টি ভারতীয় ক্রিকেটে নতুন কোনো সমস্যা নয়। বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে তুলনামূলক কম বয়সী খেলোয়াড়দের সুযোগ পাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকায় জন্মতারিখ নিয়ে কারচুপির অভিযোগ মাঝেমধ্যেই সামনে আসে। এই প্রবণতা বন্ধ করতে বিসিসিআই অতীতেও নানা পদক্ষেপ নিয়েছে। ২০২০ সালে সংস্থাটি এমন একটি সাধারণ ক্ষমার ব্যবস্থার কথাও জানিয়েছিল, যেখানে নিবন্ধিত খেলোয়াড়েরা নিজেরাই বয়সসংক্রান্ত ভুল তথ্য স্বীকার করে সঠিক জন্মতারিখ জমা দিলে নির্দিষ্ট শর্তে সাময়িক বরখাস্ত এড়ানোর সুযোগ পেতেন। তবে পরবর্তী সময়ে নিয়ম ভঙ্গের প্রমাণ মিললে শাস্তির ব্যবস্থাও রাখা হয়েছিল। অর্থাৎ বয়স নিয়ে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে বোর্ড ধীরে ধীরে আরও কঠোর অবস্থান নিয়েছে।
রোহিত যাদবের ঘটনা তাই শুধু একজন ক্রিকেটারের নিষেধাজ্ঞার গল্প নয়; বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে নথিপত্রের গুরুত্বেরও বড় উদাহরণ। মাঠে প্রতিভা দেখিয়ে অনূর্ধ্ব-১৯ পর্যায়ে জায়গা করে নেওয়ার পর একজন ক্রিকেটারের ক্যারিয়ার যখন এগিয়ে যাওয়ার কথা, তখন বয়সসংক্রান্ত নথির অসঙ্গতি তাঁর পথ থামিয়ে দিতে পারে। তিন ভিন্ন জন্মসাল, আধার কার্ডে একাধিক তথ্য এবং শেষ পর্যন্ত দল থেকে বাদ পড়া—সব মিলিয়ে রোহিতের সামনে এখন কঠিন সময়। একই সঙ্গে সিএবির আরও ৬৪ ক্রিকেটারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার ঘটনা বলছে, বয়স জালিয়াতির বিরুদ্ধে ভারতীয় ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলো এবার আগের চেয়ে অনেক বেশি সতর্ক। এই ঘটনায় বয়সভিত্তিক ক্রিকেটে খেলোয়াড়দের নথিপত্র যাচাইয়ের গুরুত্বও নতুন করে সামনে এসেছে।




























