ম্যাগনেশিয়াম শরীরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি খনিজ। এটি পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রম, শক্তি উৎপাদন এবং হৃদযন্ত্রের কার্যক্রমসহ শরীরের বিভিন্ন প্রক্রিয়ায় ভূমিকা রাখে। খাবারে পর্যাপ্ত ম্যাগনেশিয়াম না পাওয়া বা শরীরে এর মাত্রা কমে গেলে কিছু শারীরিক পরিবর্তন দেখা দিতে পারে।
তবে নিচের কোনো একটি লক্ষণ থাকলেই যে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি হয়েছে, এমন নয়। এসব সমস্যার পেছনে আরও অনেক কারণ থাকতে পারে।
১. খিটখিটে মেজাজ
ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা কমে গেলে কিছু মানুষের মধ্যে খিটখিটে মেজাজ বা মানসিক অস্বস্তি দেখা দিতে পারে। মস্তিষ্কের বিভিন্ন নিউরোট্রান্সমিটারের কার্যক্রমে ম্যাগনেশিয়ামের ভূমিকা রয়েছে। তবে মেজাজের পরিবর্তনের সঙ্গে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতির সম্পর্ক পুরোপুরি বোঝার জন্য আরও গবেষণা প্রয়োজন।
২. বমিভাব
ম্যাগনেশিয়াম পেশির স্বাভাবিক কার্যক্রম ও পরিপাকতন্ত্রের নড়াচড়ায় ভূমিকা রাখে। এর ঘাটতির সঙ্গে বমিভাব ও বমির মতো কিছু গ্যাস্ট্রোইনটেস্টাইনাল উপসর্গের সম্পর্ক পাওয়া গেছে। তবে বমিভাবের আরও অনেক কারণ থাকতে পারে।
৩. ক্ষুধা কমে যাওয়া
ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতির সঙ্গে ক্ষুধামন্দার সম্পর্ক থাকতে পারে। হজমের সমস্যা, বমিভাব, পেট ফাঁপা বা অস্বস্তির মতো উপসর্গ থাকলেও খাবারের প্রতি আগ্রহ কমে যেতে পারে।
৪. সবসময় ক্লান্ত লাগা
শরীরে শক্তি উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ প্রক্রিয়ায় ম্যাগনেশিয়াম প্রয়োজন। বিশেষ করে ATP নামের অণুর সঙ্গে ম্যাগনেশিয়ামের সম্পর্ক রয়েছে, যা কোষের প্রধান শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে। তাই ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা কমে গেলে দুর্বলতা বা ক্লান্তির অনুভূতি হতে পারে।
তবে ঘুমের অভাব, মানসিক চাপ, কিছু ওষুধ ও বিভিন্ন শারীরিক সমস্যার কারণেও দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি হতে পারে।
৫. হাত-পায়ে অবশ বা ঝিনঝিন অনুভূতি
স্নায়ুর স্বাভাবিক সংকেত আদান-প্রদানে ম্যাগনেশিয়ামের ভূমিকা রয়েছে। এর ঘাটতি হলে কিছু ক্ষেত্রে হাত-পায়ে ঝিনঝিন, অবশভাব, ব্যথা বা জ্বালাপোড়ার মতো অনুভূতি দেখা দিতে পারে। তবে এ ধরনের উপসর্গের কারণ হিসেবে ডায়াবেটিসসহ অন্যান্য সমস্যাও থাকতে পারে।
৬. মাথাব্যথা
ম্যাগনেশিয়াম স্নায়ুর কার্যক্রম ও রক্তনালির স্বাভাবিক কার্যক্রমে ভূমিকা রাখে। কিছু গবেষণায় ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা এবং বিশেষ করে মাইগ্রেনের মধ্যে সম্পর্ক পাওয়া গেছে।
তবে সব ধরনের মাথাব্যথার কারণ ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতি নয়। নিয়মিত বা তীব্র মাথাব্যথা হলে কারণ নির্ণয় করা জরুরি।
৭. ঘুমের সমস্যা
পর্যাপ্ত ঘুম শরীরের সামগ্রিক সুস্থতার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। ম্যাগনেশিয়াম শরীরের কিছু নিউরোট্রান্সমিটার ও মেলাটোনিনের কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত। কিছু গবেষণায় ম্যাগনেশিয়াম গ্রহণ এবং ভালো ঘুমের মধ্যে সম্পর্ক দেখা গেলেও, ম্যাগনেশিয়াম ঘাটতিই যে ঘুমের সমস্যার সরাসরি কারণ, তা সব ক্ষেত্রে নিশ্চিত নয়।
৮. পেশিতে টান বা খিঁচুনি
ম্যাগনেশিয়াম পেশি ও স্নায়ুর স্বাভাবিক কার্যক্রমে গুরুত্বপূর্ণ। মাত্রা কমে গেলে পেশিতে টান, খিঁচুনি বা অনিচ্ছাকৃত পেশি কাঁপার মতো সমস্যা দেখা দিতে পারে।
বিশেষ করে রাতে পায়ের পেশিতে খিঁচুনি হওয়ার সঙ্গে ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতির সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা রয়েছে। তবে পেশিতে খিঁচুনির আরও অনেক কারণ থাকতে পারে এবং ম্যাগনেশিয়াম সাপ্লিমেন্ট সবার ক্ষেত্রে একইভাবে কাজ করে না।
৯. হৃদস্পন্দন অস্বাভাবিক লাগা
শরীরে ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা খুব কমে গেলে হৃদযন্ত্রের বৈদ্যুতিক কার্যক্রম ও ইলেকট্রোলাইটের ভারসাম্যে সমস্যা হতে পারে। এর ফলে বুক ধড়ফড় করা বা হৃদস্পন্দন অনিয়মিত মনে হওয়ার মতো উপসর্গ দেখা দিতে পারে।
বুক ধড়ফড়ের সঙ্গে শ্বাসকষ্ট, মাথা ঘোরা বা অস্বস্তি থাকলে বিষয়টি অবহেলা না করে চিকিৎসকের পরামর্শ নেওয়া জরুরি।
কারা ম্যাগনেশিয়ামের ঘাটতির ঝুঁকিতে
কিছু মানুষের শরীরে ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা কমে যাওয়ার ঝুঁকি তুলনামূলক বেশি। যেমন—
- বয়স্ক ব্যক্তি
- ক্রোনস ডিজিজ, সিলিয়াক ডিজিজ বা অন্যান্য অন্ত্রের রোগে আক্রান্ত ব্যক্তি
- টাইপ-২ ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তি
- দীর্ঘদিন অতিরিক্ত অ্যালকোহল গ্রহণ করেন এমন ব্যক্তি
- কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ গ্রহণকারী ব্যক্তি
বিশেষ করে কিছু ডাইইউরেটিক, প্রোটন পাম্প ইনহিবিটর ও নির্দিষ্ট ইমিউনোসাপ্রেসিভ ওষুধ শরীরে ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রাকে প্রভাবিত করতে পারে।
খাবার থেকেই কীভাবে ম্যাগনেশিয়াম পাবেন
খাদ্যতালিকায় ম্যাগনেশিয়ামসমৃদ্ধ খাবার যোগ করা এর মাত্রা বজায় রাখার একটি ভালো উপায়। গাঢ় সবুজ শাক, বাদাম, বীজ, ডাল ও পূর্ণ শস্যে ম্যাগনেশিয়াম পাওয়া যায়।
চিয়া সিড ও কুমড়ার বীজও ম্যাগনেশিয়ামের ভালো উৎস। পাশাপাশি পালং শাক ও কিছু মাছ খাদ্যতালিকায় রাখা যেতে পারে।
খাবার থেকে পর্যাপ্ত পুষ্টি পাওয়া সম্ভব না হলে চিকিৎসকের পরামর্শে সাপ্লিমেন্ট বিবেচনা করা যেতে পারে। ম্যাগনেশিয়াম সাইট্রেট ও ম্যাগনেশিয়াম অক্সাইডসহ বিভিন্ন ধরনের সাপ্লিমেন্ট বাজারে পাওয়া যায়, তবে সব ধরনের ম্যাগনেশিয়াম শরীরে একইভাবে শোষিত হয় না।
কখন চিকিৎসকের পরামর্শ নেবেন
শুধু কয়েকটি লক্ষণ দেখে নিজের থেকে ম্যাগনেশিয়াম সাপ্লিমেন্ট শুরু করা ঠিক নয়। বিশেষ করে দীর্ঘস্থায়ী ক্লান্তি, বারবার পেশিতে খিঁচুনি, অবশভাব বা বুক ধড়ফড়ের মতো সমস্যা হলে এর পেছনে অন্য কোনো কারণ আছে কি না, তা চিকিৎসকের মাধ্যমে যাচাই করা প্রয়োজন। প্রয়োজন অনুযায়ী রক্ত পরীক্ষা বা অন্যান্য পরীক্ষা করে ম্যাগনেশিয়ামের মাত্রা মূল্যায়ন করা যেতে পারে।


























