ইয়েমেনে নতুন করে উত্তেজনা ছড়িয়েছে। হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করেছে দেশটির সরকারি বাহিনী। মারিব ও হাদরামউত প্রদেশে সেনাঘাঁটি লক্ষ্য করে হুথিদের সাম্প্রতিক হামলার পর পাল্টা জবাব হিসেবে এই সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে ইয়েমেনের সেনাবাহিনী। সেনাবাহিনীর দাবি, বিভিন্ন ফ্রন্টে হুথিদের অবস্থান, সামরিক সরঞ্জাম ও গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি লক্ষ্য করে অভিযান পরিচালনা করা হচ্ছে। ফলে দীর্ঘদিনের সংঘাতের মধ্যে নতুন করে বড় ধরনের সামরিক উত্তেজনার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। সাম্প্রতিক আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে ইয়েমেনের সরকারি বাহিনী ও হুথিদের মধ্যে সংঘর্ষ আবারও তীব্র হওয়ার ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে।
সেনাবাহিনীর মুখপাত্র কর্নেল মাজেদ আল-নুজাইলির বক্তব্য অনুযায়ী, হুথিদের হামলার জবাব দিতে বিভিন্ন এলাকায় সামরিক তৎপরতা বাড়ানো হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, হুথিরা বিদেশি সহায়তায় ইয়েমেনকে বৃহত্তর আঞ্চলিক সংঘাতের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। একই সঙ্গে তাদের কর্মকাণ্ড দেশের অর্থনীতি ও নিরাপত্তার ওপর চাপ তৈরি করছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। সেনাবাহিনী জানিয়েছে, হামলা অব্যাহত থাকলে আরও কঠোর প্রতিক্রিয়া দেখানো হতে পারে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে হুথিদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিকভাবে বিস্তারিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তাই সংঘাতের পরবর্তী গতিপথ এখনো অনিশ্চিত।
মারিবে সাম্প্রতিক হামলা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, হুথিদের হামলায় সরকারি বাহিনীর সদস্যদের প্রাণহানি হয়েছে এবং একই সময়ে সৌদি আরব-সংশ্লিষ্ট লক্ষ্যবস্তুকেও আক্রমণের আওতায় আনা হয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসের প্রতিবেদনে সরকারি সূত্রের বরাতে পূর্ব ইয়েমেনে সামরিক ঘাঁটিতে হামলায় অন্তত ১৭ সেনা নিহত হওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এর পাশাপাশি মারিবে ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় বেসামরিক হতাহত হওয়ার খবরও এসেছে। এসব ঘটনা দেখাচ্ছে, সংঘাত শুধু সামরিক অবস্থানেই সীমাবদ্ধ থাকছে না; সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাও বড় উদ্বেগ হয়ে উঠছে।
এই পরিস্থিতিতে হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান ইয়েমেনের দীর্ঘস্থায়ী সংঘাতে নতুন মোড় আনতে পারে। ২০২২ সালের যুদ্ধবিরতির পর বড় ধরনের স্থলযুদ্ধ তুলনামূলকভাবে কমে এলেও সাম্প্রতিক মাসগুলোতে উত্তেজনা আবার বাড়ছে। ইয়েমেনের সেনাবাহিনী গত কয়েক বছর ধরে নিজেদের কমান্ড কাঠামো ও সামরিক সক্ষমতা পুনর্গঠনের চেষ্টা করছে। জুনে ইয়েমেনের সেনাপ্রধান জানিয়েছিলেন, সামরিক নেতৃত্ব ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের কাঠামো আরও সমন্বিত করা হয়েছে এবং যুদ্ধবিরতির পর বাহিনীর সক্ষমতা পুনর্গঠনে অগ্রগতি হয়েছে।
নতুন করে সংঘাত বাড়লে এর প্রভাব ইয়েমেনের সীমানার বাইরেও পড়তে পারে। বিশেষ করে বাব আল-মান্দাব প্রণালি দিয়ে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও জ্বালানি পরিবহনের ওপর বাড়তি ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস জানিয়েছে, সাম্প্রতিক হুথি হামলার কারণে সৌদি-সংশ্লিষ্ট জাহাজ চলাচল নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্যিক নৌপথগুলোর একটি হওয়ায় এই এলাকায় দীর্ঘস্থায়ী অস্থিরতা দেখা দিলে জাহাজ চলাচল, বীমা খরচ ও পণ্য পরিবহনে প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। ফলে ইয়েমেনের সামরিক উত্তেজনা এখন শুধু স্থানীয় সংঘাত হিসেবে দেখার সুযোগ নেই।
সব মিলিয়ে, হুথিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু হওয়ার খবর ইয়েমেনের সংঘাতকে আবারও আন্তর্জাতিক আলোচনার কেন্দ্রে নিয়ে এসেছে। সরকারি বাহিনী যদি অভিযান আরও বিস্তৃত করে এবং হুথিরাও পাল্টা হামলা বাড়ায়, তাহলে পরিস্থিতি দ্রুত আরও জটিল হতে পারে। একই সঙ্গে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা, খাদ্য ও অর্থনৈতিক সংকট এবং গুরুত্বপূর্ণ নৌপথের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ বাড়বে। এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই সামরিক তৎপরতা সীমিত পাল্টা জবাবের মধ্যে থাকবে, নাকি ইয়েমেনে দীর্ঘদিন পর আবার বড় আকারের সংঘাতের সূচনা করবে। পরিস্থিতির পরবর্তী কয়েক দিন তাই বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
























