ইরাকে একটি সন্দেহভাজন ইরানি ড্রোন নিষ্ক্রিয় করার সময় নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণে মার্কিন সেনা সার্জেন্ট মাইকেল ইমানুয়েল সুইন্টনের মৃত্যু যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক বাহিনীর জন্য বড় ধাক্কা হিসেবে দেখা হচ্ছে। ঘটনাটি এমন এক সময় ঘটল, যখন মধ্যপ্রাচ্যজুড়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে উত্তেজনা তীব্র আকার ধারণ করেছে এবং বিভিন্ন সামরিক ঘাঁটিতে নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করা হয়েছে।
মার্কিন সামরিক বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, উত্তর ইরাকের কুর্দিস্তান অঞ্চলের ইরবিল এয়ার বেসেErbil Air Base) গত রবিবার একটি সন্দেহভাজন ইরানি ড্রোন নিরাপদে নিষ্ক্রিয় করার অভিযান পরিচালনা করা হয়। বিস্ফোরক নিষ্ক্রিয়করণ (Explosive Ordnance Disposal-EOD) দলের সদস্য হিসেবে সার্জেন্ট সুইন্টন ড্রোনটি পরীক্ষা করছিলেন।
ড্রোনটি ধ্বংস করতে একটি নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণ (Controlled Detonation) পরিচালনার সময় অপ্রত্যাশিত বিস্ফোরণ ঘটে। এতে তিনি গুরুতর আহত হন এবং ঘটনাস্থলেই তার মৃত্যু হয়। বিস্ফোরণের সুনির্দিষ্ট কারণ এখনও আনুষ্ঠানিকভাবে প্রকাশ করা হয়নি।
নিহত মাইকেল ইমানুয়েল সুইন্টনের বয়স ছিল ৩০ বছর। তিনি যুক্তরাষ্ট্রের নর্থ ক্যারোলাইনা অঙ্গরাজ্যের ফায়েটভিল এলাকার বাসিন্দা ছিলেন। সেনাবাহিনীতে তিনি বিস্ফোরক শনাক্ত ও নিষ্ক্রিয়করণে বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করতেন।
সহকর্মীদের ভাষ্য অনুযায়ী, সুইন্টন ছিলেন অত্যন্ত দক্ষ, সাহসী এবং অভিজ্ঞ একজন সেনাসদস্য। মধ্যপ্রাচ্যে একাধিক অভিযানে অংশ নেওয়ার অভিজ্ঞতাও ছিল তার।
মার্কিন সেনাবাহিনী জানিয়েছে, অসাধারণ সাহসিকতা ও দায়িত্ব পালনের স্বীকৃতিস্বরূপ তাকে মরণোত্তর কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সামরিক সম্মাননা প্রদান করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে—
- Bronze Star Medal (ব্রোঞ্জ স্টার)
- Purple Heart (পার্পল হার্ট)
- Combat Action Badge (কমব্যাট অ্যাকশন ব্যাজ)
এছাড়া মৃত্যুর পর তাকে স্টাফ সার্জেন্ট পদে পদোন্নতি দেওয়া হবে।
সুইন্টনের স্ত্রী মিয়া গনজালেজ-সুইন্টন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে এক আবেগঘন বার্তায় জানান, রবিবার সেনাবাহিনীর কর্মকর্তারা তাকে স্বামীর মৃত্যুর খবর দেন।
তিনি লেখেন,
“আমি কখনোই এই শোক কাটিয়ে উঠতে পারব না। তোমার তো বাড়ি ফেরার কথা ছিল। তুমি ফিরে এলে আমাদের কত পরিকল্পনা ছিল। আমার ভেতরটা ভেঙে যাচ্ছে।”
দম্পতির একটি ছোট মেয়ে রয়েছে। পরিবারের প্রতি সমবেদনা জানিয়েছে মার্কিন সেনাবাহিনী এবং নিহত সেনার ইউনিটের সদস্যরা।
ঘটনার পরপরই মার্কিন সামরিক কর্তৃপক্ষ একটি আনুষ্ঠানিক তদন্ত শুরু করেছে। তদন্তে খতিয়ে দেখা হচ্ছে—
- ড্রোনটিতে কী ধরনের বিস্ফোরক ছিল।
- নিয়ন্ত্রিত বিস্ফোরণের সময় কী ধরনের প্রযুক্তিগত ত্রুটি ঘটেছিল।
- নিরাপত্তা প্রটোকল যথাযথভাবে অনুসরণ করা হয়েছিল কি না।
- ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ঘটনা এড়াতে কী ধরনের পরিবর্তন আনা দরকার।
তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত বাহিনী এ বিষয়ে বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
উত্তর ইরাকের ইরবিল এয়ার বেস যুক্তরাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক জোট বাহিনীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সামরিক ঘাঁটি। এখান থেকে আইএসবিরোধী অভিযান, গোয়েন্দা কার্যক্রম এবং আঞ্চলিক নিরাপত্তা তৎপরতা পরিচালিত হয়।
সাম্প্রতিক মাসগুলোতে এই ঘাঁটি লক্ষ্য করে একাধিক ড্রোন ও রকেট হামলার চেষ্টা হয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, এসব হামলার পেছনে ইরান-সমর্থিত সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর সম্পৃক্ততা রয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের চলমান উত্তেজনার কারণে ড্রোন হামলা এবং পাল্টা নিরাপত্তা অভিযান উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। আধুনিক ড্রোন প্রযুক্তি এখন আঞ্চলিক সংঘাতে গুরুত্বপূর্ণ অস্ত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। ফলে ড্রোন শনাক্ত, নিষ্ক্রিয় এবং ধ্বংস করার অভিযানও আগের তুলনায় অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
সার্জেন্ট সুইন্টনের মৃত্যু সেই ঝুঁকিরই একটি মর্মান্তিক উদাহরণ বলে মনে করছেন সামরিক বিশ্লেষকরা। ঘটনাটি শুধু একটি দুর্ঘটনা নয়, বরং মধ্যপ্রাচ্যে চলমান নিরাপত্তা পরিস্থিতির জটিলতাকেও নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে।

























