ঘুমের অভাব কি ডায়াবেটিস ডেকে আনে এই বিষয় নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই গবেষণা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে ডায়াবেটিস প্রতিরোধে ঘুম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হলেও অনেকেই বিষয়টিকে গুরুত্ব দেন না। ব্যস্ত জীবন, অতিরিক্ত কাজ কিংবা রাত জেগে মোবাইল ব্যবহার করার কারণে অনেকেরই নিয়মিত ঘুম কম হয়। অনেকে আবার মনে করেন, সপ্তাহজুড়ে কম ঘুমিয়ে ছুটির দিনে বেশি সময় ঘুমালেই সব ঘাটতি পূরণ হয়ে যাবে। কিন্তু বিশেষজ্ঞরা বলছেন, বাস্তবতা ভিন্ন। দীর্ঘদিন পর্যাপ্ত ঘুম না হলে শরীরের ভেতরে এমন কিছু পরিবর্তন ঘটে, যা ধীরে ধীরে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়িয়ে দিতে পারে।
গবেষণায় দেখা গেছে, নিয়মিত সাত ঘণ্টার কম ঘুম হলে শরীরে ইনসুলিনের কার্যকারিতা কমতে শুরু করে। ইনসুলিন এমন একটি হরমোন, যা রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে সাহায্য করে। ঘুমের অভাবে শরীরে প্রদাহ বেড়ে যায়, হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হয় এবং শরীরের স্বাভাবিক জৈবঘড়ি বা সার্কাডিয়ান রিদম ব্যাহত হয়। ফলে রক্তে শর্করা নিয়ন্ত্রণে রাখতে শরীরকে অতিরিক্ত পরিশ্রম করতে হয়। তাই ডায়াবেটিস প্রতিরোধে ঘুম নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি।
তবে এক বা দুই রাত কম ঘুম হলেই যে ডায়াবেটিস হবে, এমন নয়। সুস্থ মানুষের ক্ষেত্রে স্বল্প সময়ের ঘুমের ঘাটতি সাধারণত সাময়িক প্রভাব ফেলে। পর্যাপ্ত বিশ্রাম ও ভালো ঘুমের মাধ্যমে শরীর আবার আগের অবস্থায় ফিরে আসতে পারে। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখনই, যখন দিনের পর দিন ঘুমের ঘাটতি চলতেই থাকে। দীর্ঘদিন কম ঘুম হলে ইনসুলিনের সংবেদনশীলতা কমে যায় এবং শরীরের স্বাভাবিক বিপাক প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হয়।
বিশেষজ্ঞরা আরও জানান, ঘুম কম হলে স্ট্রেস হরমোন কর্টিসলের মাত্রা বেড়ে যায়। একই সঙ্গে ক্ষুধা নিয়ন্ত্রণকারী হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট হওয়ায় মিষ্টি ও উচ্চ ক্যালরিযুক্ত খাবারের প্রতি আকর্ষণ বাড়ে। এর ফলে ওজন বৃদ্ধি, স্থূলতা এবং ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি তৈরি হয়। এসব কারণ মিলেই পরবর্তীতে টাইপ-২ ডায়াবেটিস হওয়ার সম্ভাবনা বেড়ে যেতে পারে। তাই ডায়াবেটিস প্রতিরোধে ঘুম শুধু আরাম নয়, সুস্থ জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী, একজন সুস্থ প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের প্রতি রাতে অন্তত ৭ থেকে ৯ ঘণ্টা মানসম্মত ঘুম নিশ্চিত করা উচিত। শুধু ঘুমের সময় বাড়ালেই হবে না, প্রতিদিন নির্দিষ্ট সময়ে ঘুমাতে যাওয়া এবং নির্দিষ্ট সময়ে ঘুম থেকে ওঠার অভ্যাসও গড়ে তুলতে হবে। রাতে অতিরিক্ত ক্যাফেইন, দীর্ঘ সময় মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার এবং অনিয়মিত জীবনযাপন কমিয়ে আনলে ঘুমের মান অনেকটাই উন্নত হয়।
সবশেষে মনে রাখতে হবে, ছুটির দিনে অতিরিক্ত ঘুমিয়ে সপ্তাহজুড়ে হওয়া ঘুমের ঘাটতি পুরোপুরি পূরণ করা সম্ভব নয়। তাই নিয়মিত পর্যাপ্ত ঘুমের অভ্যাস গড়ে তোলাই ডায়াবেটিসসহ বিভিন্ন দীর্ঘমেয়াদি রোগের ঝুঁকি কমানোর অন্যতম কার্যকর উপায়। সুস্থ থাকতে সুষম খাদ্য, নিয়মিত ব্যায়াম এবং পর্যাপ্ত ঘুম—এই তিনটি বিষয়কে সমান গুরুত্ব দিন। ছোট একটি অভ্যাসের পরিবর্তনই ভবিষ্যতে বড় স্বাস্থ্যঝুঁকি থেকে আপনাকে দূরে রাখতে পারে।





























