চন্দনাইশ প্রতিনিধিঃ মো. নুরুল আলম
চট্টগ্রামে মাদকাসক্তি দিন দিন উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে। নগরীতে আনুমানিক সোয়া লাখেরও বেশি মানুষ মাদকাসক্ত হলেও তাদের জন্য প্রয়োজনীয় চিকিৎসা ও পুনর্বাসন সুবিধা এখনো অনেক সীমিত। এই বাস্তবতায় সরকারি হাসপাতাল, পুনর্বাসন কেন্দ্র এবং চিকিৎসা শয্যা বাড়ানোর পাশাপাশি সমন্বিত সামাজিক আন্দোলন গড়ে তোলার আহ্বান জানিয়েছেন বিভিন্ন খাতের বিশেষজ্ঞরা।
বৃহস্পতিবার (৩০ জুলাই) সকাল ১১টায় চট্টগ্রাম নগরীর সিআরবি তাসফিয়া গার্ডেনে ইনফো বাংলার উদ্যোগে আয়োজিত মাদকবিরোধী এক সভায় এসব দাবি উঠে আসে। সভায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর, সাংবাদিক, শিক্ষাবিদ, আইনজীবী, মনোবিজ্ঞানী, সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব এবং বিভিন্ন মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। অনুষ্ঠান শেষে অতিথিদের সম্মানে মধ্যাহ্নভোজেরও আয়োজন করা হয়। সভার প্রধান অতিথি ছিলেন র্যাব-৭-এর অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল মো. হাফিজুর রহমান। প্রধান বক্তা হিসেবে বক্তব্য দেন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম উত্তর বিভাগের উপপরিচালক (ডিডি) সিরাজুল মোস্তফা।
বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন দৈনিক পূর্বকোণের সাবেক বার্তা সম্পাদক ও চট্টগ্রাম সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আবু তাহের মুহাম্মদ, দৈনিক পূর্বদেশের সহযোগী সম্পাদক ও অপর্ণাচরণ স্কুল অ্যান্ড কলেজের অধ্যাপক আবু তালেব বেলাল, ফ্যাশন ডিজাইনার রওশন আরা চৌধুরী এবং ছোবানিয়া আলিয়া মাদ্রাসার উপাধ্যক্ষ। আলোচনায় বক্তারা বলেন, চট্টগ্রামে মাদকাসক্তি এখন একটি বড় সামাজিক ও জনস্বাস্থ্য সংকটে পরিণত হয়েছে। আনুমানিক সোয়া লাখেরও বেশি মানুষ মাদকের সঙ্গে জড়িয়ে থাকলেও সরকারি ও বেসরকারি পর্যায়ে চিকিৎসা ও পুনর্বাসনের জন্য প্রয়োজনীয় শয্যা নেই। ফলে অনেক রোগী সময়মতো চিকিৎসা শুরু করতে পারছেন না এবং পুনর্বাসনের সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

বক্তারা প্রতিটি বিভাগে আধুনিক সরকারি মাদক নিরাময় হাসপাতাল প্রতিষ্ঠা, বিদ্যমান সরকারি ও বেসরকারি পুনর্বাসন কেন্দ্রের শয্যাসংখ্যা বৃদ্ধি, দক্ষ জনবল নিয়োগ এবং সহজলভ্য চিকিৎসা নিশ্চিত করার দাবি জানান। তাদের মতে, মাদকাসক্তদের শুধু আইনের দৃষ্টিতে নয়, একজন চিকিৎসাপ্রার্থী হিসেবেও দেখা প্রয়োজন। সভায় আরও বলা হয়, শুধু আইন প্রয়োগ করে চট্টগ্রামে মাদকাসক্তি কমানো সম্ভব নয়। পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান, সামাজিক সংগঠন, গণমাধ্যম এবং নাগরিক সমাজকে একসঙ্গে কাজ করতে হবে। তরুণদের মধ্যে সচেতনতা বাড়াতে নিয়মিত প্রচার-প্রচারণা, স্কুল-কলেজভিত্তিক কর্মসূচি এবং সামাজিক উদ্যোগ জোরদার করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গণমাধ্যমের দায়িত্ব নিয়েও সভায় বিশেষ আলোচনা হয়। বক্তারা বলেন, সংবাদ প্রকাশের সময় মাদকাসক্ত ব্যক্তিদের পরিচয়, ছবি বা ব্যক্তিগত তথ্য প্রকাশে সর্বোচ্চ সংযম দেখাতে হবে। কারণ সামাজিকভাবে হেয়প্রতিপন্ন হওয়ার ভয় অনেককে চিকিৎসা গ্রহণ থেকে বিরত রাখে। তাই দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা মাদকবিরোধী আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন ইনফো বাংলা ও ডেইলি মর্নিং টুডের প্রকাশক ও সম্পাদক কল্যাণ চক্রবর্তী।
সভায় উপস্থিত ছিলেন ইনফো বাংলা ও ডেইলি মর্নিং টুডের নির্বাহী সম্পাদক আলী আহমেদ শাহীন, ডেপুটি এডিটর শামসুল হুদা মিন্টু, সহযোগী সম্পাদক এস. এম. আহসানুল কবির চৌধুরী টিটু, সিটি এডিটর রাসেল দাশ, সিনিয়র রিপোর্টার মশিউর রহমান নয়ন, সহযোগী সম্পাদক সাজিয়া আফরিন লাকী, সাব-এডিটর সৌমেন সরকার ও এনি বিশ্বাস, মাল্টিমিডিয়া রিপোর্টার রাইছা হাসান, শর্মিষ্ঠা ভট্টাচার্য, আবু সাইদ, আইবিএনএ ও ইনফো বাংলার রিপোর্টার টিপু সুলতান এবং সিনিয়র সাংবাদিক ও চট্টগ্রাম প্রেস ক্লাবের সদস্য রবি শংকর চক্রবর্তীসহ আরও অনেকে। এছাড়াও অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন সুপ্রিম কোর্টের অ্যাডভোকেট মোছাম্মৎ সাজেদা আমিন চৌধুরী, মনোবিজ্ঞানী সানজিদা নাছরিন, হুমাইরা আক্তার, বিশিষ্ট নারী উদ্যোক্তা এনি আরিয়ান, জাতীয় পুরস্কারপ্রাপ্ত শিল্পী ও টিভি উপস্থাপক আঁখি দৃষ্টি এবং এলআরবি ব্যান্ডের সদস্য গোলামুর রহমান রোমেলসহ বিভিন্ন সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠনের প্রতিনিধিরা।
মাদকাসক্তি নিরাময় ও পুনর্বাসন কেন্দ্রগুলোর মধ্যে উপস্থিত ছিলেন হেল্পের পরিচালক মোরশেদ আলম শিপন, অঙ্কুরের পরিচালক মঞ্জুর হোসেন পিন্টু, আর্কের দিদারুল ইসলাম, শুকতারার রূপতনু কর পমি, আভার শাহাদাৎ দস্তগীর, ফেয়ার লাইফের সাজ্জাদ হোসেন ও মো. মুন্না, দীপের মো. ফয়েজ, স্রোতের মো. লিটন, দৃষ্টির পরিচালক জাহেদ হাসান প্লাবন, আলোর সহপরিচালক মো. শাহ জামান, এলার্টের মো. শাকিল, লিংকন বড়ুয়া এবং প্রশান্তির পরিচালক সাইফুদ্দিন লাভলুসহ বিভিন্ন পুনর্বাসন কেন্দ্রের পরিচালকরা। সভার শেষাংশে বক্তারা বলেন, চট্টগ্রামে মাদকাসক্তি রোধে সরকার, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী, চিকিৎসক, পুনর্বাসন কেন্দ্র, গণমাধ্যম, পরিবার এবং সাধারণ নাগরিকদের সমন্বিত উদ্যোগের কোনো বিকল্প নেই। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা এবং সামাজিক সচেতনতা একসঙ্গে বাস্তবায়ন করতে পারলেই একটি মাদকমুক্ত চট্টগ্রাম ও মাদকমুক্ত বাংলাদেশ গড়ে তোলা সম্ভব হবে।




























