ঢাকা ০৭:৫০ অপরাহ্ন, বুধবার, ০৩ জুন ২০২৬, ২০ জ্যৈষ্ঠ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম :
Logo হাম মৃত্যু ছাড়াল ৬০০, নতুন আক্রান্ত আরও ৫৫ Logo আর্জেন্টিনা নয়, ব্রাজিলও নয়; সবচেয়ে দামি দল ফ্রান্স Logo সুন্দরবন ভ্রমণ প্যাকেজ: খরচ, দর্শনীয় স্থান ও পূর্ণ গাইড Logo খুরশিদ আলম ইসলামী ব্যাংকের চেয়ারম্যান, স্ত্রীর ঋণ খেলাপি হওয়া বাধা নয়: বাংলাদেশ ব্যাংক Logo স্পেন দলে জার্সি চমক, ১০ নম্বর পেলেন ওলমো; আলোচনায় গাভির নতুন পরিচয় Logo এসএসসি পরীক্ষা সূচি নিয়ে শিক্ষামন্ত্রীর বক্তব্য Logo ডেঙ্গু চিকিৎসা সহজ করতে বেসরকারি হাসপাতালে বড় ছাড়ের প্রস্তাব Logo ব্যাটারিচালিত রিকশা মহানগর এলাকার বাইরে পুনর্বাসনের পরিকল্পনা Logo সিভি ভুল এড়ানোর গাইড: চাকরি পেতে জরুরি টিপস Logo ডেঙ্গু আক্রান্ত বৃদ্ধি: ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে ভর্তি ৭৭ জনের নতুন তথ্য

ত্বকে ব্রণ কেন হয় ও দূর করার কার্যকর উপায়

কিছু ব্রণ মাসিকের সময় অথবা মেনোপজের সময় দেখা যেতে পারে

ত্বকে ব্রণের সমস্যা এখন শুধু কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সব বয়সী মানুষের মধ্যেই এটি একটি সাধারণ ত্বকজনিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মুখে ছোট ছোট ফুসকুড়ি, লালচে প্রদাহ, পুঁজ জমা দানা কিংবা কালো দাগ—সব মিলিয়ে ব্রণ অনেকের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাকনে ভালগারিস বা ব্রণ মূলত ত্বকের তৈলগ্রন্থির একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা, যা অবহেলা করলে ত্বকে স্থায়ী দাগও তৈরি হতে পারে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমাদের ত্বকের নিচে থাকা তৈলগ্রন্থি থেকে স্বাভাবিকভাবে সেবাম বা প্রাকৃতিক তেল বের হয়। এই তেল ত্বককে মসৃণ ও সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে। তবে যখন অতিরিক্ত সেবাম তৈরি হয়, তখন তা হেয়ার ফলিকলের মুখ বন্ধ করে দেয় এবং সেখানে ময়লা, ধুলাবালি ও মৃত কোষ জমে গিয়ে ব্রণের সৃষ্টি হয়।

ব্রণের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। সাধারণত হোয়াইটহেড, ব্ল্যাকহেড, পুঁজভর্তি পাশ্চুল, ফোলা পিম্পল, শক্ত নডিউল এবং গভীর সিস্ট—সবই ব্রণের বিভিন্ন রূপ হিসেবে পরিচিত। কারও ক্ষেত্রে এগুলো ছোট আকারে দেখা দিলেও কারও ত্বকে বড় ও ব্যথাযুক্ত আকার ধারণ করে। বিশেষ করে মুখ, গলা, বুক, কাঁধ ও পিঠে এসব ব্রণ বেশি দেখা যায়।

ত্বক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রণ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নষ্ট করে না, বরং অনেক সময় মানসিক চাপের কারণও হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘদিন ধরে ব্রণ থাকলে ত্বকে স্থায়ী গর্ত, কালো দাগ কিংবা প্রদাহের চিহ্ন থেকে যেতে পারে। তাই শুরু থেকেই সঠিক যত্ন ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

ব্রণের অন্যতম বড় কারণ হলো বংশগত প্রভাব। যদি পরিবারের বাবা-মা বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে কারও তীব্র ব্রণের ইতিহাস থাকে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এই সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। জেনেটিক কারণের ফলে অনেকের ত্বক স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল উৎপাদন করে, যা ব্রণ তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়।

হরমোনের পরিবর্তনও ব্রণের একটি বড় কারণ। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস থাকলে শরীরে অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে তৈলগ্রন্থি অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ব্রণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এছাড়া মাসিকের আগে, গর্ভাবস্থায় কিংবা মেনোপজের সময়ও অনেকের ব্রণ দেখা দিতে পারে।

কৈশোরে হরমোনের তারতম্যের কারণেও ব্রণের প্রকোপ বাড়ে। এ সময় শরীরে দ্রুত শারীরিক পরিবর্তন ঘটে এবং ত্বকের তেল উৎপাদন স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এজন্য কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ব্রণের সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের ব্রণ কমে এলেও কারও ক্ষেত্রে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাত্রার নানা অভ্যাসও ব্রণ বাড়িয়ে দিতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা স্ট্রেস শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা তৈলগ্রন্থিকে আরও সক্রিয় করে তোলে। ফলে ত্বকে তেল জমে গিয়ে সহজেই ব্রণ তৈরি হয়। নিয়মিত ঘুমের অভাব ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়।

এছাড়া কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও ব্রণ হতে পারে। যেসব ওষুধে স্টেরয়েড, অ্যান্ড্রোজেন বা নির্দিষ্ট ধরনের হরমোন থাকে, সেগুলো দীর্ঘদিন সেবন করলে ত্বকে ব্রণের প্রকোপ বাড়তে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ ব্যবহার না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

অনেক সময় ভুল প্রসাধনী ব্যবহারের কারণেও ব্রণ দেখা দেয়। অতিরিক্ত তৈলাক্ত বা ভারী মেকআপ ত্বকের ছিদ্র বন্ধ করে দেয়। আবার অপরিষ্কার ব্রাশ, স্পঞ্জ বা প্রসাধনী সামগ্রী ব্যবহার করলে ব্যাকটেরিয়া জমে ত্বকে সংক্রমণ তৈরি হতে পারে। এজন্য ত্বকের ধরন অনুযায়ী প্রসাধনী বেছে নেওয়া জরুরি।

খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও ব্রণের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন অনেক চিকিৎসক। অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার, ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি জাতীয় খাবার শরীরে প্রদাহ বাড়াতে পারে। যদিও সব মানুষের ক্ষেত্রে একই প্রভাব পড়ে না, তবু সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখলে ত্বক সুস্থ থাকে।

ব্রণ হলে অনেকেই ঘন ঘন মুখ ধোয়া বা নখ দিয়ে খোঁটানোর অভ্যাস করেন। এতে ত্বকের প্রদাহ আরও বেড়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনে দুইবার মৃদু ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত ঘষাঘষি করলে ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হালকা ধরনের ব্রণের ক্ষেত্রে সাধারণত টপিক্যাল চিকিৎসা ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রেটিনয়েড মলম, বেঞ্জয়েল পার-অক্সাইড বা অ্যান্টিবায়োটিক জেল বেশ কার্যকর। এসব ওষুধ ত্বকের ছিদ্র পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ কমায়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যবহার করা ঠিক নয়।

মাঝারি বা গুরুতর ব্রণের ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার ওষুধ দেওয়া হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ কিংবা আইসোট্রেটিনইন জাতীয় ওষুধ ব্যবহৃত হয়। তবে এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, তাই অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সেবন করতে হয়।

ত্বকের গভীরে তৈরি হওয়া ব্যথাযুক্ত ব্রণের জন্য অনেক সময় ইন্ট্রালেশনাল ইনজেকশন দেওয়া হয়। এতে প্রদাহ দ্রুত কমে যায় এবং ব্যথা উপশম হয়। বড় আকারের সিস্টিক ব্রণের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা।

বর্তমানে কেমিক্যাল পিল ও লেজার চিকিৎসাও ব্রণ নিয়ন্ত্রণে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কেমিক্যাল পিলের মাধ্যমে ত্বকের মৃত কোষ দূর করা হয় এবং নতুন কোষ গঠনে সহায়তা করা হয়। অন্যদিকে লেজার চিকিৎসা ত্বকের প্রদাহ কমিয়ে দাগ হালকা করতে সাহায্য করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রণের চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত ত্বকের যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি পান, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে ব্রণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। এছাড়া নিয়মিত বালিশের কভার ও তোয়ালে পরিষ্কার রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সূর্যের অতিরিক্ত তাপও অনেক সময় ত্বকের ক্ষতি করে এবং ব্রণের দাগ আরও গাঢ় করে তোলে। এজন্য বাইরে বের হলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা জরুরি। তবে এমন সানস্ক্রিন বেছে নিতে হবে, যা ত্বকের ছিদ্র বন্ধ করে না।

চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইনে প্রচারিত সব ধরনের ঘরোয়া উপায় নিরাপদ নয়। লেবু, টুথপেস্ট বা অতিরিক্ত বেকিং সোডা ব্যবহার করলে ত্বকে জ্বালাপোড়া ও ক্ষতি হতে পারে। তাই যেকোনো চিকিৎসা বা পণ্য ব্যবহারের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ত্বকের সমস্যা দীর্ঘদিন অবহেলা না করে শুরুতেই সঠিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ সময়মতো চিকিৎসা নিলে ব্রণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং স্থায়ী দাগের ঝুঁকিও কমে আসে। সচেতনতা, নিয়মিত যত্ন এবং চিকিৎসকের পরামর্শই পারে ব্রণের সমস্যা থেকে স্বস্তি দিতে।

জনপ্রিয় সংবাদ

হাম মৃত্যু ছাড়াল ৬০০, নতুন আক্রান্ত আরও ৫৫

ত্বকে ব্রণ কেন হয় ও দূর করার কার্যকর উপায়

Update Time : ১২:১৬:০৬ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ২১ মে ২০২৬

ত্বকে ব্রণের সমস্যা এখন শুধু কিশোর-কিশোরীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং সব বয়সী মানুষের মধ্যেই এটি একটি সাধারণ ত্বকজনিত সমস্যায় পরিণত হয়েছে। মুখে ছোট ছোট ফুসকুড়ি, লালচে প্রদাহ, পুঁজ জমা দানা কিংবা কালো দাগ—সব মিলিয়ে ব্রণ অনেকের আত্মবিশ্বাস কমিয়ে দেয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অ্যাকনে ভালগারিস বা ব্রণ মূলত ত্বকের তৈলগ্রন্থির একটি দীর্ঘমেয়াদি সমস্যা, যা অবহেলা করলে ত্বকে স্থায়ী দাগও তৈরি হতে পারে।

চিকিৎসকদের ভাষ্য অনুযায়ী, আমাদের ত্বকের নিচে থাকা তৈলগ্রন্থি থেকে স্বাভাবিকভাবে সেবাম বা প্রাকৃতিক তেল বের হয়। এই তেল ত্বককে মসৃণ ও সুরক্ষিত রাখতে সাহায্য করে। তবে যখন অতিরিক্ত সেবাম তৈরি হয়, তখন তা হেয়ার ফলিকলের মুখ বন্ধ করে দেয় এবং সেখানে ময়লা, ধুলাবালি ও মৃত কোষ জমে গিয়ে ব্রণের সৃষ্টি হয়।

ব্রণের বিভিন্ন ধরন রয়েছে। সাধারণত হোয়াইটহেড, ব্ল্যাকহেড, পুঁজভর্তি পাশ্চুল, ফোলা পিম্পল, শক্ত নডিউল এবং গভীর সিস্ট—সবই ব্রণের বিভিন্ন রূপ হিসেবে পরিচিত। কারও ক্ষেত্রে এগুলো ছোট আকারে দেখা দিলেও কারও ত্বকে বড় ও ব্যথাযুক্ত আকার ধারণ করে। বিশেষ করে মুখ, গলা, বুক, কাঁধ ও পিঠে এসব ব্রণ বেশি দেখা যায়।

ত্বক বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রণ শুধু বাহ্যিক সৌন্দর্য নষ্ট করে না, বরং অনেক সময় মানসিক চাপের কারণও হয়ে দাঁড়ায়। দীর্ঘদিন ধরে ব্রণ থাকলে ত্বকে স্থায়ী গর্ত, কালো দাগ কিংবা প্রদাহের চিহ্ন থেকে যেতে পারে। তাই শুরু থেকেই সঠিক যত্ন ও চিকিৎসা নেওয়া জরুরি।

ব্রণের অন্যতম বড় কারণ হলো বংশগত প্রভাব। যদি পরিবারের বাবা-মা বা নিকট আত্মীয়দের মধ্যে কারও তীব্র ব্রণের ইতিহাস থাকে, তাহলে পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যেও এই সমস্যা দেখা দেওয়ার আশঙ্কা থাকে। জেনেটিক কারণের ফলে অনেকের ত্বক স্বাভাবিকের তুলনায় বেশি তেল উৎপাদন করে, যা ব্রণ তৈরির ঝুঁকি বাড়ায়।

আরও পড়ুন  হাম-রুবেলা টিকাদান কর্মসূচি ২০২৬: কাল থেকে শুরু হচ্ছে দেশের ১৮ জেলায়

হরমোনের পরিবর্তনও ব্রণের একটি বড় কারণ। বিশেষ করে নারীদের মধ্যে পলিসিস্টিক ওভারি সিনড্রোম বা পিসিওএস থাকলে শরীরে অ্যান্ড্রোজেন হরমোনের মাত্রা বেড়ে যায়। এতে তৈলগ্রন্থি অতিরিক্ত সক্রিয় হয়ে ওঠে এবং ব্রণের পরিমাণ বাড়তে থাকে। এছাড়া মাসিকের আগে, গর্ভাবস্থায় কিংবা মেনোপজের সময়ও অনেকের ব্রণ দেখা দিতে পারে।

কৈশোরে হরমোনের তারতম্যের কারণেও ব্রণের প্রকোপ বাড়ে। এ সময় শরীরে দ্রুত শারীরিক পরিবর্তন ঘটে এবং ত্বকের তেল উৎপাদন স্বাভাবিকের চেয়ে বেড়ে যায়। এজন্য কিশোর-কিশোরীদের মধ্যে ব্রণের সমস্যা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। তবে বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অনেকের ব্রণ কমে এলেও কারও ক্ষেত্রে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, জীবনযাত্রার নানা অভ্যাসও ব্রণ বাড়িয়ে দিতে পারে। অতিরিক্ত মানসিক চাপ বা স্ট্রেস শরীরে কর্টিসল হরমোন বাড়িয়ে দেয়, যা তৈলগ্রন্থিকে আরও সক্রিয় করে তোলে। ফলে ত্বকে তেল জমে গিয়ে সহজেই ব্রণ তৈরি হয়। নিয়মিত ঘুমের অভাব ও অতিরিক্ত দুশ্চিন্তাও এই সমস্যাকে বাড়িয়ে দেয়।

এছাড়া কিছু ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াতেও ব্রণ হতে পারে। যেসব ওষুধে স্টেরয়েড, অ্যান্ড্রোজেন বা নির্দিষ্ট ধরনের হরমোন থাকে, সেগুলো দীর্ঘদিন সেবন করলে ত্বকে ব্রণের প্রকোপ বাড়তে পারে। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এসব ওষুধ ব্যবহার না করার পরামর্শ দিচ্ছেন বিশেষজ্ঞরা।

অনেক সময় ভুল প্রসাধনী ব্যবহারের কারণেও ব্রণ দেখা দেয়। অতিরিক্ত তৈলাক্ত বা ভারী মেকআপ ত্বকের ছিদ্র বন্ধ করে দেয়। আবার অপরিষ্কার ব্রাশ, স্পঞ্জ বা প্রসাধনী সামগ্রী ব্যবহার করলে ব্যাকটেরিয়া জমে ত্বকে সংক্রমণ তৈরি হতে পারে। এজন্য ত্বকের ধরন অনুযায়ী প্রসাধনী বেছে নেওয়া জরুরি।

আরও পড়ুন  পর্যাপ্ত ঘুম ও পুষ্টি: সুস্থ জীবনের ভারসাম্য

খাদ্যাভ্যাসের সঙ্গেও ব্রণের সম্পর্ক রয়েছে বলে মনে করেন অনেক চিকিৎসক। অতিরিক্ত তেলযুক্ত খাবার, ফাস্টফুড, কোমল পানীয় ও অতিরিক্ত চিনি জাতীয় খাবার শরীরে প্রদাহ বাড়াতে পারে। যদিও সব মানুষের ক্ষেত্রে একই প্রভাব পড়ে না, তবু সুষম খাদ্যাভ্যাস বজায় রাখলে ত্বক সুস্থ থাকে।

ব্রণ হলে অনেকেই ঘন ঘন মুখ ধোয়া বা নখ দিয়ে খোঁটানোর অভ্যাস করেন। এতে ত্বকের প্রদাহ আরও বেড়ে যেতে পারে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, দিনে দুইবার মৃদু ফেসওয়াশ দিয়ে মুখ পরিষ্কার করাই যথেষ্ট। অতিরিক্ত ঘষাঘষি করলে ত্বকের সুরক্ষাব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

হালকা ধরনের ব্রণের ক্ষেত্রে সাধারণত টপিক্যাল চিকিৎসা ব্যবহার করা হয়। এর মধ্যে রেটিনয়েড মলম, বেঞ্জয়েল পার-অক্সাইড বা অ্যান্টিবায়োটিক জেল বেশ কার্যকর। এসব ওষুধ ত্বকের ছিদ্র পরিষ্কার রাখতে সাহায্য করে এবং ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ কমায়। তবে চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া দীর্ঘদিন ব্যবহার করা ঠিক নয়।

মাঝারি বা গুরুতর ব্রণের ক্ষেত্রে মুখে খাওয়ার ওষুধ দেওয়া হতে পারে। কিছু ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক, হরমোন নিয়ন্ত্রণকারী ওষুধ কিংবা আইসোট্রেটিনইন জাতীয় ওষুধ ব্যবহৃত হয়। তবে এসব ওষুধের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া থাকতে পারে, তাই অবশ্যই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সেবন করতে হয়।

ত্বকের গভীরে তৈরি হওয়া ব্যথাযুক্ত ব্রণের জন্য অনেক সময় ইন্ট্রালেশনাল ইনজেকশন দেওয়া হয়। এতে প্রদাহ দ্রুত কমে যায় এবং ব্যথা উপশম হয়। বড় আকারের সিস্টিক ব্রণের ক্ষেত্রে এই পদ্ধতি বেশ কার্যকর বলে মনে করেন চিকিৎসকেরা।

আরও পড়ুন  সিয়ামের মৃত্যু: হামে আক্রান্ত শিশুর পরিবারের পাশে তারেক রহমান

বর্তমানে কেমিক্যাল পিল ও লেজার চিকিৎসাও ব্রণ নিয়ন্ত্রণে জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে। কেমিক্যাল পিলের মাধ্যমে ত্বকের মৃত কোষ দূর করা হয় এবং নতুন কোষ গঠনে সহায়তা করা হয়। অন্যদিকে লেজার চিকিৎসা ত্বকের প্রদাহ কমিয়ে দাগ হালকা করতে সাহায্য করে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ব্রণের চিকিৎসার পাশাপাশি নিয়মিত ত্বকের যত্ন নেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। পর্যাপ্ত পানি পান, স্বাস্থ্যকর খাবার খাওয়া, পর্যাপ্ত ঘুম এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখলে ব্রণের ঝুঁকি অনেকটাই কমে যায়। এছাড়া নিয়মিত বালিশের কভার ও তোয়ালে পরিষ্কার রাখারও পরামর্শ দিয়েছেন তারা।

সূর্যের অতিরিক্ত তাপও অনেক সময় ত্বকের ক্ষতি করে এবং ব্রণের দাগ আরও গাঢ় করে তোলে। এজন্য বাইরে বের হলে সানস্ক্রিন ব্যবহার করা জরুরি। তবে এমন সানস্ক্রিন বেছে নিতে হবে, যা ত্বকের ছিদ্র বন্ধ করে না।

চিকিৎসকেরা সতর্ক করে বলেছেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা অনলাইনে প্রচারিত সব ধরনের ঘরোয়া উপায় নিরাপদ নয়। লেবু, টুথপেস্ট বা অতিরিক্ত বেকিং সোডা ব্যবহার করলে ত্বকে জ্বালাপোড়া ও ক্ষতি হতে পারে। তাই যেকোনো চিকিৎসা বা পণ্য ব্যবহারের আগে বিশেষজ্ঞের পরামর্শ নেওয়া উচিত।

ত্বকের সমস্যা দীর্ঘদিন অবহেলা না করে শুরুতেই সঠিক ব্যবস্থা নেওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন বিশেষজ্ঞরা। কারণ সময়মতো চিকিৎসা নিলে ব্রণ নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব এবং স্থায়ী দাগের ঝুঁকিও কমে আসে। সচেতনতা, নিয়মিত যত্ন এবং চিকিৎসকের পরামর্শই পারে ব্রণের সমস্যা থেকে স্বস্তি দিতে।