বাংলাদেশের স্বর্ণবাজারে আজ সোমবার (২০ জুলাই ২০২৬) সোনার দাম অপরিবর্তিত রয়েছে। সর্বশেষ গত ১৪ জুলাই বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) প্রতি ভরি সোনার দাম ২ হাজার ১৫৮ টাকা কমানোর ঘোষণা দেয়। এরপর থেকে নতুন করে আর কোনো মূল্য সমন্বয় করা হয়নি। ফলে আজও দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে ওই নির্ধারিত দামেই সোনা বিক্রি হচ্ছে।
বাজুস জানায়, স্থানীয় বাজারে তেজাবি সোনা (পিওর গোল্ড)-এর দাম কমে যাওয়ায় আন্তর্জাতিক বাজার, আমদানি ব্যয় এবং সার্বিক বাজার পরিস্থিতি পর্যালোচনা করে নতুন মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সেই সিদ্ধান্তই এখনো কার্যকর রয়েছে।
আজকের সোনার দাম (প্রতি ভরি ১১.৬৬৪ গ্রাম)-
| ক্যারেট | দাম |
|---|---|
| ২২ ক্যারেট | ২,১৯,৮০৮ টাকা |
| ২১ ক্যারেট | ২,০৯,৮৯৪ টাকা |
| ১৮ ক্যারেট | ১,৮০,২৬৭ টাকা |
| সনাতন পদ্ধতির সোনা | ১,৪৭,৩১৬ টাকা |
উল্লেখিত দাম কেবল খাঁটি সোনার মূল্য। গয়না কেনার সময় ক্রেতাকে আরও যেসব খরচ বহন করতে হবে, সেগুলো হলো—
- ডিজাইনভেদে মেকিং চার্জ (মজুরি)।
- অলঙ্কারে ব্যবহৃত পাথর বা অন্যান্য উপাদানের মূল্য (যদি থাকে)।
- প্রযোজ্য ভ্যাট, যা বিক্রয়মূল্যের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বাজুস স্পষ্ট করেছে, যেহেতু স্বর্ণালঙ্কার ও রুপার গয়নার বিক্রয়মূল্যের সঙ্গে ভ্যাট অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাই গ্রাহকের কাছ থেকে আলাদাভাবে ভ্যাট আদায় করা যাবে না।
বাজুসের আগের নিয়ম অনুযায়ী—
- অলঙ্কার এক্সচেঞ্জ (বদল) বা পারচেজ (পুরোনো সোনা বিক্রি)-এর ক্ষেত্রে সুনির্দিষ্ট ভ্যাট, মজুরি এবং পাথরের মূল্য বাদ দিয়ে হিসাব করা হবে।
- এ বিষয়ে পূর্বের নীতিমালাই বহাল থাকবে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, দেশের বাজারে সোনার দাম নির্ধারণে কয়েকটি বিষয় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে—
- আন্তর্জাতিক বাজারে স্বর্ণের মূল্য বৃদ্ধি বা হ্রাস।
- স্থানীয় বাজারে পিওর গোল্ডের দাম।
- মার্কিন ডলারের বিনিময় হার।
- আমদানি ব্যয় ও শুল্ক।
- দেশীয় বাজারে চাহিদা ও সরবরাহের পরিস্থিতি।
এসব কারণে বাজুস প্রয়োজন অনুযায়ী সময়ে সময়েই সোনার দাম পুনর্নির্ধারণ করে থাকে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন জানিয়েছে, পরবর্তী ঘোষণা না দেওয়া পর্যন্ত দেশের সব জুয়েলারি প্রতিষ্ঠানে এই মূল্যই কার্যকর থাকবে। তবে অলঙ্কারের নকশা, ওজন ও কারিগরি কাজের ধরন অনুযায়ী মজুরির পরিমাণ ভিন্ন হতে পারে। তাই গয়না কেনার আগে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে মোট মূল্য (সোনার দাম + মজুরি + অন্যান্য চার্জ) জেনে নেওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশে সোনার দাম নির্ধারণে আন্তর্জাতিক বাজার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। বৈশ্বিক বাজারে স্বর্ণের দাম বাড়লে বা কমলে তার প্রভাব কিছুটা সময়ের ব্যবধানে দেশের বাজারেও পড়ে। এছাড়া মার্কিন ডলারের বিনিময় হার, আমদানি ব্যয়, ব্যাংকিং খরচ এবং স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ সোনার সরবরাহও দাম নির্ধারণে প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বাজুস) মূল্য নির্ধারণ ও মূল্য পর্যবেক্ষণ কমিটি নিয়মিতভাবে আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজার, স্থানীয় বাজারে পিওর গোল্ডের দাম, ডলারের বিনিময় হার এবং সামগ্রিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করে সোনার নতুন মূল্য নির্ধারণ করে। প্রয়োজন হলে কমিটি দাম বাড়ানো বা কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়।
সোনা কেনার সময় যেসব বিষয় খেয়াল রাখবেন-
- বাজুস নির্ধারিত মূল্যতালিকার সঙ্গে দোকানের মূল্য মিলিয়ে নিন।
- অবশ্যই রসিদ সংগ্রহ করুন।
- হলমার্কযুক্ত (Hallmark) সোনার অলঙ্কার কিনুন।
- অলঙ্কারের ওজন, ক্যারেট ও মজুরি আলাদাভাবে জেনে নিন।
- পাথরযুক্ত গয়না হলে পাথরের মূল্য কত রাখা হয়েছে তা নিশ্চিত করুন।
অনেকেই সোনাকে নিরাপদ বিনিয়োগ হিসেবে বিবেচনা করেন। শেয়ারবাজার বা অন্যান্য বিনিয়োগে অস্থিরতা দেখা দিলে অনেক বিনিয়োগকারী সোনার দিকে ঝুঁকেন। তবে স্বল্পমেয়াদে দামের ওঠানামা হতে পারে, তাই বিনিয়োগের আগে বাজার পরিস্থিতি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বাজুসের সর্বশেষ সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, শুধু সোনাই নয়, রুপার দামেও নতুন কোনো পরিবর্তনের ঘোষণা আসেনি। ফলে আগের নির্ধারিত দামেই দেশের বাজারে রুপার অলঙ্কার ও অন্যান্য পণ্য বিক্রি হচ্ছে।
বাজার বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে বড় ধরনের পরিবর্তন, ডলারের বিনিময় হারের ওঠানামা কিংবা স্থানীয় বাজারে বিশুদ্ধ সোনার দামে পরিবর্তন হলে বাজুস আবারও নতুন মূল্য ঘোষণা করতে পারে। তাই সোনা কেনা বা বিক্রির আগে সর্বশেষ মূল্য যাচাই করা বুদ্ধিমানের কাজ হবে।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সোনার অলঙ্কার কেনার সময় শুধু প্রতি ভরির দাম নয়, মজুরি, ভ্যাট, ক্যারেট এবং হলমার্কের বিষয়টিও গুরুত্ব দিয়ে দেখা উচিত। এতে অতিরিক্ত খরচ এড়ানো যায় এবং ভবিষ্যতে অলঙ্কার বিক্রি বা বদল করার সময়ও সুবিধা পাওয়া যায়।
বাংলাদেশে সবচেয়ে বেশি বিক্রি হয় ২২ ক্যারেটের সোনার অলঙ্কার। কারণ এটি বিশুদ্ধতা ও স্থায়িত্বের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখে। ২৪ ক্যারেট সোনা তুলনামূলক নরম হওয়ায় অলঙ্কার তৈরিতে কম ব্যবহৃত হয়। অন্যদিকে ২১ ও ১৮ ক্যারেটের সোনা অপেক্ষাকৃত কম দামে পাওয়া যায় এবং বিভিন্ন ডিজাইনের গয়নায় ব্যবহার করা হয়।
বাংলাদেশে সোনার দাম সাধারণত প্রতি ভরি (১১.৬৬৪ গ্রাম) হিসেবে প্রকাশ করা হয়। তবে অনেক ক্রেতা গ্রাম হিসেবেও সোনা কেনেন। সে হিসেবে বর্তমান দামে আনুমানিক—
- ২২ ক্যারেট: প্রতি গ্রাম প্রায় ১৮,৮৪৬ টাকা
- ২১ ক্যারেট: প্রতি গ্রাম প্রায় ১৭,৯৯৪ টাকা
- ১৮ ক্যারেট: প্রতি গ্রাম প্রায় ১৫,৪৫৫ টাকা
তবে অলঙ্কারের ক্ষেত্রে মজুরি ও অন্যান্য চার্জ যোগ হওয়ায় প্রতি গ্রামের চূড়ান্ত দাম আরও বেশি হতে পারে।
অনেকের ধারণা, বাজারদর অনুযায়ী পুরো টাকা ফেরত পাওয়া যায়। বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন। পুরোনো সোনার অলঙ্কার বিক্রি বা এক্সচেঞ্জের সময় সাধারণত—
- মজুরির টাকা ফেরত পাওয়া যায় না।
- পাথরের মূল্যও অধিকাংশ ক্ষেত্রে গণনা করা হয় না।
- সোনার বিশুদ্ধতা পরীক্ষা করে দাম নির্ধারণ করা হয়।
- বাজুসের নির্ধারিত নীতিমালা অনুসরণ করে মূল্য পরিশোধ করা হয়।
ঈদ, পূজা, বিয়ের মৌসুম এবং বিভিন্ন সামাজিক অনুষ্ঠানের আগে দেশের বাজারে সোনার চাহিদা বেড়ে যায়। চাহিদা বাড়লেও বাজুস আন্তর্জাতিক ও স্থানীয় বাজার বিশ্লেষণ করেই দাম নির্ধারণ করে। তাই শুধু চাহিদা বৃদ্ধির কারণে সবসময় দাম বাড়ে না।
বিশুদ্ধ সোনা নিশ্চিত করতে হলমার্ক অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। হলমার্কযুক্ত অলঙ্কারে সোনার ক্যারেট ও বিশুদ্ধতার তথ্য উল্লেখ থাকে। ফলে ক্রেতারা প্রতারণার ঝুঁকি থেকে অনেকটাই নিরাপদ থাকেন এবং ভবিষ্যতে বিক্রি বা বদল করতেও সুবিধা পান।
বাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, বর্তমানে আন্তর্জাতিক স্বর্ণবাজারে যদি বড় ধরনের অস্থিরতা না আসে, তাহলে দেশের বাজারেও স্বল্প সময়ের মধ্যে বড় ধরনের মূল্য পরিবর্তনের সম্ভাবনা কম। তবে ডলারের বিনিময় হার বা বৈশ্বিক অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে পরিবর্তন এলে বাজুস নতুন করে মূল্য সমন্বয়ের সিদ্ধান্ত নিতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ অনুযায়ী সোনা কেনার আগে—
- একই ক্যারেটের সোনার দাম কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে যাচাই করুন।
- বাজুস নির্ধারিত মূল্য তালিকা দেখে নিন।
- অবশ্যই ক্যাশ মেমো বা চালান সংগ্রহ করুন।
- হলমার্ক ও ক্যারেট নিশ্চিত করুন।
- মজুরি ও অন্যান্য চার্জ লিখিতভাবে জেনে নিন।
এসব বিষয় অনুসরণ করলে ক্রেতারা সঠিক দামে মানসম্মত সোনার অলঙ্কার কিনতে পারবেন এবং ভবিষ্যতে বিক্রি বা এক্সচেঞ্জের সময়ও সুবিধা পাবেন



























