ঢাকা ০৬:০৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬, ১১ শ্রাবণ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ

চায়ের সঙ্গে বিস্কুট খেলে বাড়তে পারে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

প্রতিদিনের চা-বিস্কুটের অভ্যাসে বাড়তে পারে ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি।

সকালের এক কাপ গরম চায়ের সঙ্গে দুই-তিনটি বিস্কুট খাওয়া অনেকেরই প্রতিদিনের অভ্যাস। কেউ আবার শুধু বিস্কুট খাওয়ার জন্যই চা পান করেন। তবে এই সাধারণ অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসক। লন্ডনভিত্তিক চিকিৎসক ডা. সুমিত শর্মার মতে, নিয়মিত চায়ের সঙ্গে বিস্কুট খেলে শরীরের মেটাবলিজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কী?

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীর ইনসুলিন ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অগ্ন্যাশয়কে অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করতে হয়।

চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পাশাপাশি দেখা দিতে পারে—

  • সব সময় ক্লান্তি অনুভব করা
  • মনোযোগ কমে যাওয়া বা ব্রেইন ফগ
  • ওজন বৃদ্ধি
  • পেটের চারপাশে চর্বি জমা
  • ক্ষুধা বারবার ফিরে আসা

ডা. শর্মা বলেন, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বারবার বেড়ে যাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দিতে শুরু করে।

কেন বিস্কুট শরীরের জন্য সমস্যা তৈরি করে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে পাওয়া অধিকাংশ বিস্কুটে এমন কিছু উপাদান থাকে, যা খুব দ্রুত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

এসব উপাদানের মধ্যে রয়েছে—

  • পরিশোধিত ময়দা, যা খুব দ্রুত হজম হয়।
  • অতিরিক্ত চিনি, যা রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ায়।
  • পরিশোধিত ভেজিটেবল অয়েল, যা শরীরে প্রদাহের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  • ফাইবারের ঘাটতি, ফলে গ্লুকোজ ধীরে শোষিত হওয়ার সুযোগ থাকে না।
  • প্রোটিনের পরিমাণ খুব কম, তাই দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে না।

চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, এমনকি সাধারণ ডাইজেস্টিভ বিস্কুটও অনেক ক্ষেত্রে সাদা পাউরুটির মতোই গ্লাইসেমিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

চা-বিস্কুট খাওয়ার পর শরীরে কী ঘটে?

ডা. শর্মা জানান, চায়ের সঙ্গে দুটি বিস্কুট খেলেও শরীরে একটি নির্দিষ্ট চক্র তৈরি হতে পারে।

ঘটনাটি সাধারণত এভাবে ঘটে—

  • বিস্কুট খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বেড়ে যায়।
  • শরীর অতিরিক্ত ইনসুলিন নিঃসরণ করে।
  • প্রায় ৬০ থেকে ৯০ মিনিট পরে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ কমে যায়।
  • এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ক্ষুধা অনুভূত হয়।
  • তখন অনেকেই আরও বিস্কুট বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খেয়ে ফেলেন।

এভাবেই বারবার খাওয়ার একটি অভ্যাস তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ওজন বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কেন একটি বিস্কুটে থামা কঠিন?

চিকিৎসকের মতে, আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে মস্তিষ্কের তৃপ্তির অনুভূতি সহজে আসে না।

বিস্কুটে থাকা—

  • চিনি
  • চর্বি
  • লবণ

—এই তিন উপাদানের বিশেষ সংমিশ্রণ মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়। ফলে একটি বিস্কুট খাওয়ার পর আরও কয়েকটি খেয়ে ফেলার প্রবণতা তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

সুস্থ থাকতে কী করবেন?

ডা. শর্মা পরামর্শ দিয়েছেন, অন্তত চার সপ্তাহের জন্য সকালের নাশতা থেকে বিস্কুট বাদ দিয়ে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়ার।

তিনি যেসব খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন—

  • সেদ্ধ ডিম
  • পনির বা কটেজ চিজ
  • টক দই
  • চিজ
  • বিভিন্ন ধরনের বাদাম

তার মতে, এই পরিবর্তনের ফলে প্রথম সপ্তাহেই বিকেলের ক্লান্তি কমতে পারে। তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে খাবারের ফাঁকে অতিরিক্ত ক্ষুধাও কমে আসতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি শরীরের মেটাবলিজমও ভালো থাকতে পারে।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের ছোট ছোট খাদ্যাভ্যাসই ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। তাই সকালে চায়ের সঙ্গে নিয়মিত বিস্কুট খাওয়ার বদলে প্রোটিন ও পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া শরীরের জন্য বেশি উপকারী হতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, মাঝেমধ্যে পরিমিত পরিমাণে বিস্কুট খাওয়া এবং প্রতিদিন নিয়মিত বিস্কুট খাওয়ার অভ্যাস এক বিষয় নয়। ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি থাকলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।

জনপ্রিয় সংবাদ

চায়ের সঙ্গে বিস্কুট খেলে বাড়তে পারে ডায়াবেটিসের ঝুঁকি

Update Time : ০৩:৩৩:৫৪ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ জুলাই ২০২৬

সকালের এক কাপ গরম চায়ের সঙ্গে দুই-তিনটি বিস্কুট খাওয়া অনেকেরই প্রতিদিনের অভ্যাস। কেউ আবার শুধু বিস্কুট খাওয়ার জন্যই চা পান করেন। তবে এই সাধারণ অভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদে শরীরের জন্য ক্ষতিকর হতে পারে বলে সতর্ক করেছেন চিকিৎসক। লন্ডনভিত্তিক চিকিৎসক ডা. সুমিত শর্মার মতে, নিয়মিত চায়ের সঙ্গে বিস্কুট খেলে শরীরের মেটাবলিজমে সমস্যা দেখা দিতে পারে। পাশাপাশি ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স তৈরি হয়ে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকিও বেড়ে যেতে পারে।

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স কী?

ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স এমন একটি অবস্থা, যেখানে শরীর ইনসুলিন ঠিকভাবে ব্যবহার করতে পারে না। ফলে রক্তে শর্করার মাত্রা নিয়ন্ত্রণে রাখতে অগ্ন্যাশয়কে অতিরিক্ত ইনসুলিন তৈরি করতে হয়।

চিকিৎসকদের মতে, দীর্ঘদিন এই অবস্থা চলতে থাকলে টাইপ-২ ডায়াবেটিসের ঝুঁকি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যায়। পাশাপাশি দেখা দিতে পারে—

  • সব সময় ক্লান্তি অনুভব করা
  • মনোযোগ কমে যাওয়া বা ব্রেইন ফগ
  • ওজন বৃদ্ধি
  • পেটের চারপাশে চর্বি জমা
  • ক্ষুধা বারবার ফিরে আসা

ডা. শর্মা বলেন, ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্স একদিনে তৈরি হয় না। প্রতিদিন রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বারবার বেড়ে যাওয়ার কারণে ধীরে ধীরে শরীরের কোষ ইনসুলিনের প্রতি কম সাড়া দিতে শুরু করে।

কেন বিস্কুট শরীরের জন্য সমস্যা তৈরি করে?

বিশেষজ্ঞদের মতে, বাজারে পাওয়া অধিকাংশ বিস্কুটে এমন কিছু উপাদান থাকে, যা খুব দ্রুত রক্তে গ্লুকোজের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়।

এসব উপাদানের মধ্যে রয়েছে—

  • পরিশোধিত ময়দা, যা খুব দ্রুত হজম হয়।
  • অতিরিক্ত চিনি, যা রক্তে শর্করার মাত্রা দ্রুত বাড়ায়।
  • পরিশোধিত ভেজিটেবল অয়েল, যা শরীরে প্রদাহের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।
  • ফাইবারের ঘাটতি, ফলে গ্লুকোজ ধীরে শোষিত হওয়ার সুযোগ থাকে না।
  • প্রোটিনের পরিমাণ খুব কম, তাই দীর্ঘক্ষণ পেট ভরা থাকে না।

চিকিৎসকের ভাষ্য অনুযায়ী, এমনকি সাধারণ ডাইজেস্টিভ বিস্কুটও অনেক ক্ষেত্রে সাদা পাউরুটির মতোই গ্লাইসেমিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করতে পারে।

চা-বিস্কুট খাওয়ার পর শরীরে কী ঘটে?

ডা. শর্মা জানান, চায়ের সঙ্গে দুটি বিস্কুট খেলেও শরীরে একটি নির্দিষ্ট চক্র তৈরি হতে পারে।

ঘটনাটি সাধারণত এভাবে ঘটে—

  • বিস্কুট খাওয়ার পর রক্তে গ্লুকোজ দ্রুত বেড়ে যায়।
  • শরীর অতিরিক্ত ইনসুলিন নিঃসরণ করে।
  • প্রায় ৬০ থেকে ৯০ মিনিট পরে গ্লুকোজের মাত্রা হঠাৎ কমে যায়।
  • এরপর অল্প সময়ের মধ্যেই আবার ক্ষুধা অনুভূত হয়।
  • তখন অনেকেই আরও বিস্কুট বা মিষ্টিজাতীয় খাবার খেয়ে ফেলেন।

এভাবেই বারবার খাওয়ার একটি অভ্যাস তৈরি হয়, যা দীর্ঘমেয়াদে ওজন বৃদ্ধি ও ডায়াবেটিসের ঝুঁকি বাড়াতে পারে।

কেন একটি বিস্কুটে থামা কঠিন?

চিকিৎসকের মতে, আল্ট্রা-প্রসেসড খাবার এমনভাবে তৈরি করা হয়, যাতে মস্তিষ্কের তৃপ্তির অনুভূতি সহজে আসে না।

বিস্কুটে থাকা—

  • চিনি
  • চর্বি
  • লবণ

—এই তিন উপাদানের বিশেষ সংমিশ্রণ মস্তিষ্কে ডোপামিন নিঃসরণ বাড়ায়। ফলে একটি বিস্কুট খাওয়ার পর আরও কয়েকটি খেয়ে ফেলার প্রবণতা তৈরি হওয়া খুবই স্বাভাবিক।

সুস্থ থাকতে কী করবেন?

ডা. শর্মা পরামর্শ দিয়েছেন, অন্তত চার সপ্তাহের জন্য সকালের নাশতা থেকে বিস্কুট বাদ দিয়ে প্রোটিনসমৃদ্ধ খাবার বেছে নেওয়ার।

তিনি যেসব খাবার খাওয়ার পরামর্শ দিয়েছেন—

  • সেদ্ধ ডিম
  • পনির বা কটেজ চিজ
  • টক দই
  • চিজ
  • বিভিন্ন ধরনের বাদাম

তার মতে, এই পরিবর্তনের ফলে প্রথম সপ্তাহেই বিকেলের ক্লান্তি কমতে পারে। তিন থেকে চার সপ্তাহের মধ্যে খাবারের ফাঁকে অতিরিক্ত ক্ষুধাও কমে আসতে পারে। দীর্ঘমেয়াদে ইনসুলিনের কার্যকারিতা উন্নত হওয়ার পাশাপাশি শরীরের মেটাবলিজমও ভালো থাকতে পারে।

স্বাস্থ্যকর খাদ্যাভ্যাসই দীর্ঘমেয়াদি সুরক্ষা

বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রতিদিনের ছোট ছোট খাদ্যাভ্যাসই ভবিষ্যতের স্বাস্থ্যের ওপর বড় প্রভাব ফেলে। তাই সকালে চায়ের সঙ্গে নিয়মিত বিস্কুট খাওয়ার বদলে প্রোটিন ও পুষ্টিকর খাবার বেছে নেওয়া শরীরের জন্য বেশি উপকারী হতে পারে।

তবে মনে রাখতে হবে, মাঝেমধ্যে পরিমিত পরিমাণে বিস্কুট খাওয়া এবং প্রতিদিন নিয়মিত বিস্কুট খাওয়ার অভ্যাস এক বিষয় নয়। ডায়াবেটিস, স্থূলতা বা ইনসুলিন রেজিস্ট্যান্সের ঝুঁকি থাকলে খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তনের আগে চিকিৎসক বা পুষ্টিবিদের পরামর্শ নেওয়াই সবচেয়ে নিরাপদ।